ঢাকা শহরের কোনো এক গলিতে

ঢাকা শহরের কোনো এক গলিতে

- মোঃ আবু তালেব

খোলা ড্রেনের ওপর পাতা কাঠের তক্তাটা
পা ফেললেই একটু ডেবে যায়, চিঁ চিঁ করে ওঠে।
দশ তলার ঝুলন্ত বারান্দা থেকে অবিরাম চুইয়ে পড়ছে
এসি মেশিনের নোংরা পানি;
আর ঠিক তার নিচে, স্যাঁতসেঁতে দেয়ালের কালচে শ্যাওলা ঘেঁষে
দাঁড়িয়ে আছে সাত ফুটের একটা চায়ের টং দোকান।

এই গলিতে রোদ নামার জন্য কোনো আকাশ রাখা হয়নি।
মাথার ওপর কালো বিদ্যুতের তারগুলো এমন অন্ধের মতো জট পাকিয়ে আছে—
যেন এই শহরের যাবতীয় না-মেলা মামলার নথি আর দুঃস্বপ্নগুলো
কেউ দড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রেখেছে।

এখানে সন্ধ্যার পর ঢাকা শহরের আসল রূপ এসে ভিড় জমায়।

প্লাস্টিকের একটা কোণ-ভাঙা টুলে বসে থাকে এক যুবক,
যার বগলের নিচে ফাইলে চেপে রাখা আছে
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্স্ট ক্লাস সার্টিফিকেটের সতর্ক ফটোকপি।
সে কাচের বয়ামের দিকে এমন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে—
যেন ওটার ভেতর বেকারির শুকনো বিস্কুট নয়,
তার বিগত পাঁচ বছরের ক্ষয় হয়ে যাওয়া তারুণ্য বন্দি হয়ে আছে।

তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে গরম কাচের গ্লাসে ফুঁ দিচ্ছে এক রাইড শেয়ারিংয়ের তরুণ;
পিঠের ভারী ব্যাগে ঠান্ডা হতে থাকা অন্য কারও বিরিয়ানির প্যাকেট,
আর মুঠোফোনের স্ক্রিনে দ্রুত কমে আসা ব্যাটারির শতাংশ
তার চোখের পাতায় এনে দিচ্ছে এক ক্লান্ত লালচে আভা।
সে ঘণ্টায় ঘণ্টায় মানুষের দরজায় খাবার পৌঁছে দেয়,
অথচ সারাদিনে নিজের পেটে জমা হয়েছে কেবল এক কাপ লিকার চা আর দুটো কলা।

এই গলির চায়ের টেবিলে বড় বড় বিপ্লব নিয়ে কথা হয় খুব নিচু গলায়।
এখানে কোনো মাইক নেই, কোনো মঞ্চ নেই;
আছে কেবল চালের বস্তার দাম আর বাড়িভাড়ার নোটিশ নিয়ে
এক হিমশীতল নীরব আতঙ্ক।
রিকশাচালক যখন তেলচিটে একখানা বিশ টাকার নোট এগিয়ে দেয়,
দোকানি তখন কিছু না বলে নিঃশব্দে এক কাপ চা বাড়িয়ে দেয়—
এই লেনদেনে কোনো বাড়তি শব্দ খরচ হয় না,
এখানে মানুষ একে অপরের নিঃস্বতাকে চিনে নেয় কেবল চোখের ক্লান্তিতে।

ওপরের চকচকে অ্যাপার্টমেন্টগুলো এই গলিটাকে বড় অবজ্ঞার চোখে দেখে।
তারা ভারী কাচের জানালা বন্ধ করে রাখে, যাতে গলির ধোঁয়া তাদের ড্রয়িংরুমে না ঢোকে।
অথচ তারা ভুলে যায়—
তাদের ঘরের মসৃণ মেঝের দাগ মোছার হাতটা,
তাদের আবর্জনা বয়ে নিয়ে যাওয়া মানুষটা,
আর তাদের গাড়ির উইন্ডশিল্ড পরিষ্কার করা ঘামে ভেজা গামছাটা
প্রতি ভোরে এই কাদামাখা গলির ভেতর থেকেই উঠে যায়।

ঢাকা শহর বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপনে মেগা প্রজেক্টের গল্প শোনায়।
কিন্তু এই শহরের আসল প্রাণস্পন্দন কোনো বড় রাজপথে নেই;
সেটা লুকিয়ে আছে এই স্যাঁতসেঁতে, আলোহীন গলির ভেতর—
যেখানে বেঁচে থাকাটা কোনো উৎসব নয়,
প্রতিদিনের এক অন্তহীন আপস।

রাত বারোটায় যখন টং দোকানের টিমটিমে বাল্বটা নিভে যায়,
যখন নর্দমার পাশে শেষ চিলতে ধোঁয়াটুকু বাতাসে মিলিয়ে যায়—
তখন এই গলির নিস্তব্ধতা এত ভারী হয়ে ওঠে
যেন দেয়ালের প্রতিটি ইটের খাঁজে কেউ লুকিয়ে রেখে গেছে
কোটি মানুষের এক সম্মিলিত দীর্ঘশ্বাস।

এখানে যারা হাঁটে, যারা ঘুমায়, যারা নিঃশব্দে ফুরিয়ে যায়—
রাষ্ট্রের খাতায় তাদের কোনো আলাদা নাম থাকে না।
তারা কেবল ঢাকা শহরের এই অন্ধ গলির মতোই পড়ে থাকে—
বিশাল এক আধুনিক উপন্যাসের মাঝখান থেকে
ছিঁড়ে ফেলে দেওয়া এক খণ্ড অসমাপ্ত পৃষ্ঠা।


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।