শহর কাউকে কোনোদিন নিমন্ত্রণপত্র পাঠিয়ে ডাকে না।
সে শুধু দূরে দাঁড়িয়ে নীরবে লক্ষ্য করে—
নদীভাঙা মানুষ, ফসল হারানো চাষি, আর পকেটে ডিগ্রি নিয়ে ঘুরতে থাকা ক্লান্ত তরুণদের।
তারপর নিজের বিশাল গহ্বরটা একটুখানি আলগা করে দেয়।
মানুষ বাঁচার তাগিদে নিজেরাই এসে তার মুখে ঢুকে পড়ে।
শহরের কোনো হৃদয় নেই, আছে কেবল এক অতৃপ্ত পাকস্থলী।
সে প্রতিদিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে
লাখ লাখ রক্ত-মাংসের মানুষকে চিবিয়ে খেতে শুরু করে,
আর মধ্যরাতে উগরে দেয় ক্লান্ত, নিস্তেজ কতগুলো ছায়া।
এখানে বাসের পাদানিতে বাদুড়ঝোলা হয়ে থাকা যুবকের মুঠোটা
কোনো রোমাঞ্চের গল্প নয়;
ওটা হলো এক বেলার আহারের ওপর নিজের অধিকার টিকিয়ে রাখার
চরমতম লড়াই।
কাচের বহুতল ভবনে যখন বিকেলের সোনালি আলো পড়ে,
তখন শহরটাকে খুব সভ্য, খুব ঐশ্বর্যশালী মনে হয়।
কিন্তু সেই চকচকে কাচের ঠিক পায়ের নিচেই—
ফ্লাইওভারের বিশাল কংক্রিটের পিলারে ঠেস দিয়ে শুয়ে থাকে এক রিকশাচালক,
যার পায়ের শিরাগুলো ফোলা, চোখে কোনো ভাষা নেই।
শহরের সমস্ত উন্নয়ন তাকে পাশ কাটিয়ে তীব্র গতিতে ছুটে চলে যায়;
কেউ এক সেকেন্ডের জন্যও থামে না।
এখানে এত ভিড়, অথচ এর চেয়ে বড় নির্জনতা আর কোথাও নেই।
লাখো মানুষ একই ফুটপাতে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে হেঁটে যায়,
কিন্তু কারও চোখে চোখ পড়লে মানুষ সতর্ক হয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়,
অজান্তেই পকেটের মুঠোফোনটা শক্ত করে চেপে ধরে।
এখানে অন্য মানুষের প্রতি বিশ্বাস হলো এক ক্ষতিকর বিলাসিতা,
যা এই পিচের রাস্তায় পা দিলেই বিসর্জন দিতে হয়।
গ্রাম থেকে যে ছেলেটা নিজের একটা স্বতন্ত্র নাম আর স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল,
দশ বছর পর সে বাথরুমের আয়নায় তাকিয়ে আবিষ্কার করে—
তার নামের জায়গায় এখন বসে গেছে একটি আইডি কার্ডের নম্বর,
মাসের শেষ সপ্তাহের বাড়িভাড়ার আতঙ্ক,
আর ভিড় ট্রাফিকের ধোঁয়ায় পুড়ে যাওয়া এক টুকরো ফুসফুস।
শহর মানুষকে প্রচুর আলো দেয়,
কিন্তু কোনো নিরাপদ ছায়া দেয় না।
সে মানুষকে অনবরত দৌড়াতে শেখায়,
কিন্তু কোনোদিন কোনো আশ্রয়ে পৌঁছাতে দেয় না।
মাঝরাতে যখন সাইরেন আর হর্নের আওয়াজ একটু স্তিমিত হয়ে আসে,
যখন নিয়ন সাইনগুলো চোখের পলক ফেলে—
তখন এই শহরকে কোনো আধুনিক বিস্ময় মনে হয় না।
মনে হয়, এ এক নির্মম কসাইখানা—
যেখানে কোটি কোটি মানুষ এসেছিল নিজেদের একটা সম্পূর্ণ গল্প দাঁড় করাতে,
আর এই নগরী তাদের সমস্ত শব্দ একে একে কেড়ে নিয়ে
রাস্তার পিচে ফেলে রাখল কেবল এক অনন্ত অসমাপ্ত দীর্ঘশ্বাস।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।