স্মৃতি

মানুষ মনে করে স্মৃতি থাকে কাঠের ড্রয়ারের পুরনো চিঠিতে,
কিংবা মুঠোফোনের গ্যালারিতে ব্যাকআপ হয়ে যাওয়া ঝাপসা ছবিতে।
মানুষ ভাবে, ক্যালেন্ডারের পাতা ছিঁড়ে ফেললেই
পেছনের দিনগুলোকে কোনো দূরবর্তী স্টেশনে ফেলে আসা যায়।

অথচ স্মৃতির কোনো দিনপঞ্জি নেই।
তার কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই, কোনো অনুমতির তোয়াক্কা নেই।

স্মৃতি হঠাৎ চলে আসে এক কাপ ফুটন্ত চায়ের ধোঁয়ায়,
ভিড় বাসের জানালার ওপাশে মিলিয়ে যাওয়া কোনো অচেনা মানুষের হাঁটার ধরনে,
কিংবা কোনো এক শীতের রাতে বহু পুরোনো এক কোটের পকেটে
অপ্রত্যাশিতভাবে আঙুলে ঠেকে যাওয়া একটা ভাঙা বোতামের স্পর্শে।

স্মৃতির সামনে কোনো সুরক্ষাব্যবস্থা কাজ করে না।
তুমি যত বড় লোহার কপাটই টেনে দাও না কেন,
সে ঠিক চাবি ছাড়াই ঘরের ঠিক মাঝখানে এসে দাঁড়ায়।
তারপর কোনো কথা না বলে
খুব শান্ত চোখে চেয়ে থাকে—
যেন সে জানে, পালিয়ে যাওয়ার সমস্ত দরজাই এখন বন্ধ।

যা মানুষ হারিয়ে ফেলে, তার জন্য সে আফসোস করে।
কিন্তু যা কিছুতেই হারায় না—
মানুষ তার ভার বইতে গিয়ে ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যায়।

যে বাড়িটা বিশ বছর আগেই ভেঙে বহুতল দালান হয়ে গেছে,
মানুষ আজও বুকপকেটে বয়ে নিয়ে বেড়ায় সেই বাড়ির একটা মরচে ধরা চাবি।
তালাটা নেই, দরজার অস্তিত্বও মুছে গেছে—
তবু সেই অর্থহীন লোহার ওজন মানুষ কোনোদিন ফেলে দিতে পারে না।

স্মৃতি আসলে কোনো অতীত নয়;
স্মৃতি হলো বর্তমানের বুকের ওপর পা দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক নির্মম বাস্তবতা।
সে মানুষকে বর্তমানের মুখে তৃপ্তির হাসি ফোটাতে দেয় না,
ভবিষ্যতের দিকে সহজ পায়ে এগোতে দেয় না;
সে কেবল এক অদৃশ্য সুতো দিয়ে টেনে ধরে রাখে পেছনের দিকে।

আমরা নিজেদের সান্ত্বনা দিতে কত সহজে বলি—‘সময় সব ভুলিয়ে দেয়।’
সময় আসলে কিছুই ভোলায় না।
সময় কেবল তাজা ক্ষতের ওপর ধুলোর একটা পাতলা পর্দা টেনে দেয়,
যাতে পথচলতি মানুষের চোখে রক্তক্ষরণটা সহজে ধরা না পড়ে।

স্মৃতি কোনো মনোরম জাদুঘর নয়, যেখানে মানুষ অবকাশে বেড়াতে যায়।
স্মৃতি হলো মানুষের ভেতরের সেই একাকী আদালত—
যেখানে কোনো উকিল নেই, কোনো বিচারক নেই;
শুধু একজন মানুষ আজীবন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে
তারই ফেলে আসা এক অসমাপ্ত বাক্যের রায়ের জন্য।


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।