অচিন গলি

অচিন গলি

- মোঃ আবু তালেব

রাজপথের চকচকে পিচ যেখানে হঠাৎ থমকে যায়,
কাচের বহুতল ভবনের পেছনের ছায়া যেখানে গাঢ় হতে শুরু করে—
ঠিক সেখানেই মুখ লুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এই অচিন গলি।

শহরের রঙিন মানচিত্রে এর কোনো দাগ থাকে না।
বিজ্ঞাপনের ঝলমলে ব্যানারে এর কোনো উল্লেখ নেই।
এখানে কোনো উন্নয়ন উদ্বোধন করতে বড় মানুষেরা আসেন না,
কোনো ক্যামেরা এখানে খবরের সন্ধানে ঢোকে না।

অথচ এই সরু, স্যাঁতসেঁতে গলির পেট থেকেই
প্রতি ভোরে বের হয়ে আসে শহরের সমস্ত চাকা ঘোরানোর মানুষগুলো।
যে মানুষগুলো দিনশেষে বড় রাস্তার ট্রাফিকে দাঁড়িয়ে অন্য কারও কাচের গাড়ির দিকে চেয়ে থাকে,
যারা আকাশছোঁয়া অট্টালিকার বিশ তলায় উঠে দেওয়াল রঙ করে,
কিংবা যারা ঘাম ঝরিয়ে দিনশেষে ঘরে নিয়ে ফেরে
মাত্র দুটো শুকনো রুটির সংস্থান।

মাথার ওপর জট পাকিয়ে থাকা বিদ্যুতের তার,
ইটের খাঁজে জমে থাকা কালো শেওলা,
আর আধভাঙা নর্দমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক জং ধরা টিউবওয়েল—
এদের নিয়ে কোনো কবিতা লেখা হয় না।

এখানে স্বপ্নগুলো খুব বেশি ডালপালা মেলতে সাহস পায় না।
এখানে স্বপ্ন মানে—মাসের বাকি দিনগুলোতে কোনো বড় অসুখ না হওয়া।
এখানে সুখ মানে—রাতে ঘরে ফিরে চালের ড্রামটা খালি না দেখা।

আমরা যারা প্রধান সড়ক দিয়ে দ্রুত গাড়ি হাঁকিয়ে চলে যাই,
আমরা ভাবি—এই গলিটা অচেনা, এই মানুষগুলো ভিন্ন কোনো জগতের।
আমরা ভুলে যাই, এই অন্ধকারের ওপর ভিত্তি করেই
আমাদের সমস্ত আলোর সাম্রাজ্য দাঁড়িয়ে আছে।

আসলে গলিটা অচিন নয়;
আমরাই নিজেদের মুখোমুখি হওয়ার ভয়ে কখনো এদিকে তাকাই না।

কারণ এই গলির মুখে এসে দাঁড়ালে কোনো সাজানো মিথ্যা দেখা যায় না—
দেখা যায় মানুষের এমন এক অসমাপ্ত আর অনাবৃত ক্ষত,
যার দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে
আমাদের সমস্ত সভ্যতার অহংকার এক মুহূর্তে অপরাধী হয়ে যায়।


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।