কালান্তরের জলচিহ্ন

কালান্তরের জলচিহ্ন

- মোঃ আবু তালেব

(১)
এখানে পাথর নেই; স্মৃতি শুধু পলি দিয়ে গাঁথা,
নদীর শরীরে লেখা এ ভূগোলের নিগূঢ় বারতা।
ভাঙনে বিলীন হলো কত শত নগরীর চূড়া,
কাদামাটি শুষে নেয় রাজদণ্ড, শ্বেতভস্ম-গুঁড়া।
ইতিহাস কোনোদিন চেনে নাই কৃষকের ঋণ,
দলিলে মোহর এঁকে মহাজন কিনে নেয় দিন;
তবু তো থামেনি বীজ, বারবার পলিমাটি ফুঁড়ে
সবুজ পাতার শিষ জেগে ওঠে ধ্বংসের ওপারে।

(২)
আমরা কি চেয়েছিলাম ভেস্তের ওই অমলিন সুধা?
মানুষ তো বেঁচে থাকে জড়িয়ে আপন অন্ধ ক্ষুধা।
যে যুবতী ভালোবেসে ছুঁয়েছিল পুরুষের হাত,
বর্ষার বিষাদ মেখে কেটে গেছে কত দীর্ঘ রাত;
যৌবনের রূপ খসে পড়ে থাকে জরার কঙ্কাল,
নদীর অতল টানে ছিঁড়ে যায় জীবনের জাল।
সেই শূন্য ভিটে জুড়ে সন্তানের প্রথম কান্নায়—
মৃত্যুও যে হার মানে অবিনাশী প্রাণের তৃষ্ণায়।

(৩)
মহামারি ঢেলে দেয় নিশুতি বাতাসের কালকূট,
শ্মশানে ও গোরস্তানে জমে ওঠে শবের মুকুট।
মরা শিশু কোলে নিয়ে স্তব্ধ যে মা পাথরের মতো,
চেয়ে থাকে শূন্য চরে— বুকে চেপে চিরন্তন ক্ষত;
মুছে ফেলে অশ্রুজল, বুকে চেপে তীব্র সেই জ্বালা,
তপ্ত মাঠ ভেজাতে পুরুষ ছোঁয় লাঙলের ফলা।
একপাশে শকুন-চিল, নিসর্গের নির্মম বিচার—
অন্যপাশে ঘাম দিয়ে জেগে ওঠে আকুতি বাঁচার।

(৪)
শব্দ দিয়ে কতটুকু ধরে রাখা যায় এই ক্ষয়?
পঙ্‌ক্তির ভেতরে শুধু ক্ষণিকের প্রতিধ্বনি রয়।
নশ্বর এ হাত দিয়ে লিখে যাই আয়ুর বয়ান,
মহাকাল শুষে নেয় সভ্যতার অহম-প্রয়াণ;
গ্রন্থাগার ধূলি হবে, ভেঙে যাবে পাথরের স্তূপ,
আদিম আঁধার চোখে চেয়ে রবে নিসর্গের রূপ;
তবুও মানুষ এক— নক্ষত্রের বিস্মৃতির মুখে
মাটির প্রদীপ জ্বেলে পথ খোঁজে অবিনাশী বুকে।

(৫)
নদীটির চোখ নেই কোনো, নেই কোনো বিচার-আচার,
স্রোতের অতলে টেনে নেয় শতাব্দীর অন্ধ হাহাকার
আমরা বিনাশী বটে তবে, এই ঘন ছায়ার রুধিরে—
যে রহস্য আমরা রেখেছি, তা-ই ফেরে কালের গভীরে।
মৃত্যু তো শেষ কথা নয় জানি, পলিমাটি মাখা এই ঘাম—
অন্ধকারের মুখে লিখে যায় এক না-বলা মানুষের নাম।
যতদিন পলি মাটি রবে, রবে এই রোদের আভাস,
ধূলির কণিকায় মিশে রবে চিরন্তন মানুষের শ্বাস।


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।