জীবনের শেষ মুহুর্তের পর

জীবনের শেষ মুহুর্তের পর

- মো: আবু তালেব

সেদিনও বাবা বলেছিলেন,
“ফিরতে একটু দেরি হবে,
তুই ঘুমিয়ে পড়িস।”
ছোট্ট মেয়েটি দরজার পাশে
একটা প্রদীপ জ্বেলে রেখেছিল—
বাবা ফিরলে ভাত বেড়ে দেবে,
বাবা ফিরলে গল্প শুনবে,
বাবা ফিরলে বুকের ভেতর
জমে থাকা সব অভিমান ভুলে যাবে।

বাবা আর ফেরেননি।

রাত পেরিয়ে ভোর এসেছিল,
ভোর পেরিয়ে দুপুর;
দরজার পাশে প্রদীপটা নিভে গিয়েছিল,
ভাতের থালায় জমেছিল ধুলো,
আর ছোট্ট মেয়েটি প্রথমবার বুঝেছিল—
কিছু অপেক্ষার কোনো শেষ নেই,
কিছু দরজা সারাজীবন খোলা থেকেও
কাউকে ফিরিয়ে দিতে পারে না।

মানুষ বলে, বাবা মারা গেছেন।
মেয়েটি আজও বলে—
বাবা বাড়ি ফেরেননি।

এই যে একই ঘটনা,
অথচ কত আলাদা তার নাম!
মৃত্যু বুঝি সেই দূরত্বের নাম,
যেখানে সত্যি পৌঁছে যায়,
কিন্তু মন পৌঁছাতে পারে না।

একদিন আমিও চলে যাব—
আমার ঘরের চেনা চাবিটা
পড়ে থাকবে টেবিলের কোণে,
জানালার পাশে বইয়ের পাতায়
শুকিয়ে যাবে কোনো বিকেলের আলো;
আমার ব্যবহৃত চেয়ারটিতে
অন্য কেউ বসে খবর পড়বে,
আমার কাপটিতে চা ঢেলে
কেউ হয়তো বলবে—
“কাপটা সরিয়ে রাখো,
এটা ওর খুব প্রিয় ছিল।”

তারপর ধীরে ধীরে
আমার নামের পাশ থেকে
জন্মতারিখের দূরত্ব বাড়বে,
ছবির কাচে ধুলো জমবে,
আমার কণ্ঠের স্মৃতি
একদিন কণ্ঠহীন হয়ে যাবে।

যারা বলেছিল, “তোমাকে ছাড়া
আমরা এক মুহূর্তও বাঁচব না,”
তারাও একদিন বাজারে যাবে,
সন্তানের স্কুলের বেতন দেবে,
রান্নাঘরে লবণ কম হয়েছে বলে
অভিমান করবে—
পৃথিবী কাউকে শোকের ভেতর
চিরকাল আটকে রাখে না।

এই কথাটা বড় নিষ্ঠুর,
তবু এই কথাটাই সত্য।

মৃত্যু শুধু একজন মানুষকে নিয়ে যায় না,
তার সঙ্গে নিয়ে যায়
একটি পরিবারের পুরোনো পৃথিবী।
মায়ের কাছে ছেলে শুধু ছেলে নয়—
সে তার প্রথম হাঁটতে শেখা সকাল;
স্ত্রীর কাছে স্বামী শুধু স্বামী নয়—
সে বহু অসমাপ্ত কথার সাক্ষী;
একটি শিশুর কাছে বাবা শুধু বাবা নয়—
সে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।

একজন মানুষ মরে গেলে
আসলে কতগুলো পৃথিবী মরে যায়—
তার হিসাব কোনো কবরস্থানে লেখা থাকে না।

আমি একদিন কবরের পাশে দাঁড়িয়ে
এক বৃদ্ধকে কাঁদতে দেখেছিলাম।
তিনি মাটির দিকে তাকিয়ে বলছিলেন,
“তোর সঙ্গে আর ঝগড়া হবে না রে,
আর কোনো দিন তোর কাছে ক্ষমা চাওয়া হবে না।
তুই যে কথাটা বলতে চেয়েছিলি,
সেটাও আর শোনা হবে না।”

আমি বুঝলাম,
মানুষ শুধু মানুষকে হারিয়ে কাঁদে না—
কাঁদে সেই কথাগুলোর জন্য,
যেগুলো বলা হয়নি;
সেই ক্ষমাটুকুর জন্য,
যা চাওয়া হয়নি;
সেই আলিঙ্গনের জন্য,
যা দেওয়ার সময় হয়েও দেওয়া হয়নি।

মৃত্যু বড় অদ্ভুত চোর—
সে চলে যাওয়ার আগে
কোনো শব্দ করে না,
কোনো বিদায় চায় না;
শুধু একদিন এসে
আমাদের সমস্ত “পরে বলব”
চিরদিনের জন্য কেড়ে নেয়।

তাই কাউকে ভালোবাসলে
আজই তার পাশে বসো,
অভিমান থাকলে আজই বলো,
ভুল করলে আজই ক্ষমা চাও।
কাল বলে পৃথিবীতে কিছু নেই—
আছে শুধু ক্যালেন্ডারের একটি শব্দ,
যার ওপর মানুষের কোনো অধিকার নেই।

তবু আমি মৃত্যুকে
শুধু অন্ধকার বলে মানতে পারি না।
যে মা চলে গিয়েও
সন্তানের কথায় বেঁচে থাকেন,
যে বাবা মাটির নিচে থেকেও
ছেলের সততায় পাহারা দেন,
যে মানুষ হারিয়ে গিয়েও
অন্য মানুষের চোখে সাহস জ্বালান—
তাঁরা কি সত্যিই নিঃশেষ হয়ে যান?

হয়তো মানুষ ফিরে আসে না,
কিন্তু তার ভালোবাসা ফিরে আসে—
কোনো বিপন্ন রাতে সাহস হয়ে,
কোনো অসহায় শিশুর মুখে হাসি হয়ে,
কোনো অন্যায়ের সামনে
মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর শক্তি হয়ে।

মৃত্যু শরীরের ঠিকানা মুছে দেয়,
স্মৃতির সব দরজা মুছতে পারে না।
সময় ছবিকে ফিকে করে,
কিন্তু একটি ভালো কাজের আলো
কত অচেনা মানুষের জীবন ছুঁয়ে যায়—
তার হিসাব সময়ও রাখে না।

একদিন আমাকেও শুইয়ে দেবে
একটু মাটির নিচে।
আমার বুকের ভেতর জমে থাকা
সব স্বপ্ন থেমে যাবে,
আমার অসমাপ্ত কবিতার পাশে
আর কোনো শব্দ বসবে না।

তখন কেউ যদি আমার কবিতা পড়ে
এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায়,
কোনো নিঃসঙ্গ মানুষ যদি ভাবে—
“পৃথিবীতে আমার কষ্ট বোঝার মতো
আরেকজন মানুষ ছিল,”
কোনো ভীত মানুষ যদি
আমার একটি লাইন পড়ে
অন্যায়ের সামনে দাঁড়ায়—

তবে আমার মৃত্যুর পরেও
আমার জীবনের কিছুটা অংশ
পৃথিবীতে কাজ করে যাবে।

শেষ পর্যন্ত মৃত্যু কী?

একটি নিঃশ্বাসের থেমে যাওয়া?
একটি পরিচিত কণ্ঠের হারিয়ে যাওয়া?
একটি ঘরের দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া?
নাকি অসংখ্য মানুষের স্মৃতিতে
একটি মানুষের ধীরে ধীরে
অন্য অর্থ হয়ে ওঠা?

আমি জানি না।

শুধু জানি,
যে মানুষটি আজ তোমার পাশে বসে আছে,
তার হাতটি একদিন
তোমার হাতের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
যে চোখ দুটি তোমার দিকে তাকিয়ে
প্রতিদিন পৃথিবীকে সহজ করে দেয়,
সেই চোখ একদিন চিরতরে বন্ধ হবে।

তাই তার পাশে থাকো।
পৃথিবীকে জয় করার আগে
একটি মানুষের মন জয় করো।
ইতিহাসে নাম লেখানোর আগে
কারও দুঃসময়ে নিজের নাম লেখাও।

কারণ—

কবর মানুষকে মাটির কাছে ফিরিয়ে দেয়,
কিন্তু ভালোবাসা তাকে মানুষের কাছে রেখে যায়।

আর মৃত্যু?

মৃত্যু হয়তো জীবনের শেষ গল্প—
কিন্তু গল্পটি কতটা সুন্দর ছিল,
তা নির্ধারণ করে শেষ নিঃশ্বাস নয়;

তা নির্ধারণ করে,
তোমার চলে যাওয়ার দিন
কতগুলো চোখ তোমাকে খুঁজবে,
কতগুলো হৃদয় তোমার জন্য কাঁদবে,
আর কতগুলো মানুষ তোমার কাছ থেকে
মানুষ হতে শিখবে।


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।