নিখোঁজ শব্দগুলো

নিখোঁজ শব্দগুলো

- মোঃ আবু তালেব

পৃথিবীতে এখন শব্দের কোনো অভাব নেই।
চারদিকে মাইকের গর্জন, টেলিভিশনের চড়া গলা,
বিজ্ঞাপনের চিৎকার, আদালতের রায়, আর রাজনৈতিক মঞ্চের হাততালি।
সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত মানুষ অবিরাম কথা বলে চলেছে—
মোবাইল স্ক্রিনে, চায়ের দোকানে, টকশোতে, কিংবা ভিড় ট্রাফিকের হর্নে।

অথচ এই বধির করা কোলাহলের নিচে
প্রতিদিন নিঃশব্দে হাজার হাজার শব্দ নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে।

সেই শব্দগুলোর জন্য কোনো থানায় সাধারণ ডায়েরি হয় না,
সংবাদপত্রে তাদের কোনো ছবি ছাপা হয় না।

নিখোঁজ হয়ে যায় সেই শব্দটা—
যা এক শ্রমিক বলতে চেয়েছিল কারখানা মালিকের মুখের ওপর,
যখন তার মাসান্তের ঘাম থেকে কেটে নেওয়া হয়েছিল তিন দিনের হাজিরা।
কিন্তু ঘরে চাল নেই—এই কথা মনে পড়তেই
শব্দটা সে শুকনো ঢোঁকের সঙ্গে গিলে ফেলেছিল।

নিখোঁজ হয়ে যায় সেই সত্য বাক্যটা—
যা এক নাগরিক টাইপ করেছিল তার মুঠোফোনের পর্দায়;
কিন্তু ‘পাঠান’ বোতামে আঙুল ছোঁয়ানোর আগেই
মাঝরাতের দরজায় কড়া নাড়ার স্মৃতি তার মেরুদণ্ড দিয়ে বয়ে গিয়েছিল।
সে দ্রুত আঙুল চালিয়ে অক্ষরগুলো মুছে ফেলল—
স্ক্রিন আবার শাদা, যেন দেশে কোনো অন্যায় কোনোদিন ঘটেইনি।

নিখোঁজ হয়ে যায় সেই একটিমাত্র সহজ স্বীকারোক্তি—
যা স্টেশনের ব্যস্ত প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে বহু বছর পর
একজন মানুষ আরেকজনকে বলতে পারত;
কিন্তু ট্রেনের হুইসেল বেজে উঠল, ভিড় ধাক্কা দিয়ে তাদের আলাদা করে দিল,
আর শব্দটা বুকের ভেতরেই পাথর হয়ে রয়ে গেল।

ক্ষমতা সব সময় শব্দকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
সে মাইক কিনে নেয়, অভিধান বদলে দেয়, নতুন নতুন আইন বানায়।
কিন্তু ক্ষমতা এটা বুঝতে পারে না—
উচ্চারিত শব্দের চেয়ে চেপে রাখা শব্দ অনেক বেশি বিপজ্জনক।

উচ্চারিত শব্দ বাতাসে মিলিয়ে যায়,
কিন্তু যে শব্দগুলো মানুষ ভয়ে, ক্ষুধায় কিংবা অপমানে উচ্চারণ করতে পারে না—
সেগুলো হারিয়ে যায় না।
সেগুলো ভেতরে জমে জমে মানুষের ভেতরে এক গভীর ক্ষত তৈরি করে।

আমরা মনে করি, আমরা আমাদের ভাষায় বেঁচে আছি।
আসলে একজন মানুষ বেঁচে থাকে সেই না-বলা কথাগুলোর ভারে,
যা সে সারাজীবন নিজের ছায়ার কাছেও গোপন রেখেছিল।

একদিন যখন সমস্ত চাটুকারিতার মাইক বন্ধ হবে,
বিজ্ঞাপনের নিয়ন বাতিগুলো একে একে নিভে যাবে—
তখন এই নিখোঁজ শব্দগুলোই জমাট বাঁধা মাটির নিচ থেকে উঠে এসে
আমাদের সামনে এসে দাঁড়াবে।

তারা কোনো বিচার চাইবে না, কোনো ক্ষতিপূরণ চাইবে না।
তারা শুধু আমাদের চোখে চোখ রেখে একটা অমীমাংসিত প্রশ্ন ছুড়ে দেবে—

‘আমরা যখন সত্য ছিলাম,
তখন তোমরা আমাদের ফেলে দিয়ে কার জন্য এত শব্দ খরচ করেছিলে?’


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।