সবুজ মলাটের ওপর সোনালি অক্ষরে লেখা রাষ্ট্রের নাম।
প্রথম পাতায় একটি ছবি—
যেখানে মানুষটিকে খুব গম্ভীর, পরিপাটি আর অপরাধীর মতো দেখতে লাগে।
রাষ্ট্রের কাছে তার পরিচয় কেবল এই বত্রিশ পৃষ্ঠার বইটিতে;
একটি নম্বর, একটি মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার তারিখ, আর কিছু সিলমোহর।
এই পাতাগুলোতে কোনো ভৌগোলিক নদী আঁকা নেই,
নেই সবুজ ফসলের মাঠ কিংবা কোনো বটবৃক্ষের ছায়া।
অথচ প্রতিটি পৃষ্ঠার কাগজ স্পর্শ করলে বোঝা যায়—
কীভাবে এক টুকরো ভূখণ্ড
ধীরে ধীরে একজন মানুষের বুক থেকে খসে পড়ে যায়।
দূতাবাসের লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা,
ইমিগ্রেশন অফিসারের সন্দিগ্ধ চোখের সামনে মাথা নিচু করে রাখা,
আর ভিনদেশি ভাষায় নিজের অস্তিত্বের বৈধতা প্রমাণ করার জন্য কাকুতি—
সব এই কাগজের ভেতর জমাট বেঁধে আছে।
ঘামের নোনাজলে ভিজে পাসপোর্টটির কোণাগুলো এখন নরম হয়ে গেছে।
অক্ষরগুলো কিছুটা ঝাপসা,
যেভাবে ঝাপসা হয়ে যায় বহুদিন বিদেশে থাকার পর ফেলে আসা দেশের স্মৃতি।
ভিসার স্ট্যাম্পগুলো দেখতে সুন্দর—রঙিন, চকচকে;
কিন্তু এই স্ট্যাম্পগুলোর দাম চুকিয়েছে যে মানুষটি,
সে জানে এর পেছনে বিক্রি হয়ে গেছে তার সমস্ত যৌবন,
তার বাবার শেষ সম্বল একখণ্ড ধানি জমি।
আমরা যে মানচিত্রটিকে জন্মভূমি বলে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলাম,
সেই মানচিত্রটিই একদিন হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় বোঝা।
এই সামান্য পাসপোর্টটি হাতে থাকলে
পৃথিবীর যে-কোনো বিমানবন্দরে মানুষটিকে আলাদা লাইনে দাঁড়াতে হয়,
ব্যাগ খুলে দেখাতে হয় নিজের সমস্ত গোপন দৈন্য।
যেন একটি বিশেষ ভৌগোলিক রেখায় জন্ম নেওয়াই
তার জীবনের সবচেয়ে বড় অপরাধ।
পাসপোর্টটি হয়তো একদিন মেয়াদ হারিয়ে অকেজো হবে।
ড্রয়ারের এক কোণে পড়ে থাকবে পুরোনো রসিদের মতো।
কিন্তু সেই পাতার ভাঁজে ভাঁজে
লেগে থাকা এক নিঃস্ব শ্রমিকের অপমান আর দীর্ঘশ্বাস—
কোনো নতুন সিলমোহর দিয়ে
মুছে ফেলা কোনোদিন সম্ভব হবে না।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।