বধ্যভূমির নাম সচিবালয়
- মোঃ আবু তালেব
ফাইল চাপা দেওয়া কাচের টেবিলে
রক্ত কোনো শব্দ করে না।
এখানকার নিস্তব্ধ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত করিডোরে
সাইরেনের চিৎকার ঢোকে না,
কোনো বুলেটের ধাতব শিষ এখানে এসে পৌঁছায় না;
কেবল একটা দামি ঝরনা কলমের নিব
সামান্য ঘষে যায় কাগজের ওপর,
আর রাজপথে ছিটকে পড়ে
আরেকটা আঠারো বছরের তাজা মগজ।
তোমরা যাকে বলো ‘প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত’
কিংবা ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষা’,
তার উল্টো পিঠে আসলে লেখা থাকে
কত রাউন্ড তাজা সীসা
আর কত ব্যারেল বিষাক্ত গ্যাস বরাদ্দ হলো
খালি বুকের জন্য।
তোমরা লাল ফিতার বাঁধনে শুধু ফাইল আটকাওনি;
আটকে রেখেছ একটা
গোটা মানচিত্রের মুক্ত নিঃশ্বাস।
স্পেশাল ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতির ফাইল আর
সরকারি বরাদ্দের প্রতিটি স্বাক্ষরের নিচে
চাপা পড়ে আছে একটি করে পরিবারের
সারাজীবনের কান্না।
এখানে কোনো ঘাতক হেলমেট পরে ঘোরে না;
তারা ফিটফাট স্যুট পরে, টাই বাঁধে,
আর শান্ত মুখে ফাইলে চোখ বোলাতে বোলাতে
বৈধতা দিয়ে দেয় মধ্যরাতের কাফনহীন দাফনকে।
তোমরা ভেবেছ সরাসরি ট্রিগারে আঙুল না রাখলে
হাতে রক্তের দাগ লাগে না?
ভুল!
যে কলম খুনির পেছনে বাজেট অনুমোদন করে,
যে সিলমোহর নরমেধের খবরকে
‘গুজব’ বলে ধামাচাপা দেয়—
সেই দোয়াত আসলে একটি আস্ত কসাইখানার
গোপন রিজার্ভার।
এই বহুতল ভবনের ভারী কাচ ভেদ করে
তোমরা জনতাকে দেখতে পাও না;
তোমরা কেবল ক্ষমতা আর
সুযোগের অঙ্কে নিজেদের মেপে নাও।
অথচ তোমরা ভুলে গেছ—
টেবিলের ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখা
সাজানো নথিপত্র দিয়ে
মাটিতে মিশে যাওয়া রক্তের উত্তাপ
কোনোদিন ঠান্ডা করা যায় না।
যেদিন এই দুর্ভেদ্য সচিবালয়ের
সব তালা ভেঙে পড়বে,
সেদিন আর লাল ফিতার গিঁট
তোমাদের অপরাধ ঢাকতে পারবে না।
প্রতিটি ফাইলের পাতা থেকে সেদিন ঠিকরে বের হবে
মর্গের সেই বরফহীন বাতাস,
আর তোদের আরামদায়ক চেয়ারগুলোর দিকে তাকিয়ে
ইতিহাস রায় দেবে—
এরা কেউ প্রশাসক ছিল না,
এরা ছিল প্রকাশ্য এক গণহত্যার
শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কারিগর।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।