এক টুকরো পাতলা সাদা কাগজ,
তার ওপর কিছু ছাপানো আরবি হরফ,
কালো কালির বারকোড আর একটি গোল সিলমোহর।
এই কাগজটির ওজন এক তোলাও হবে না;
অথচ এই সামান্য দলিলের নিচে চাপা পড়ে আছে
একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষের জন্মগত স্বাধীনতা।
কাগজে লেখা আছে পেশা—‘শ্রমিক’।
আর লেখা আছে এক ভিনদেশি কফিলের নাম।
আইনের ভাষায় তাকে বলে স্পনসর;
বাস্তবের ভাষায় সে হলো এক আধুনিক ক্রীতদাস-মালিক—
যার ড্রয়ারে বন্ধ থাকে পাসপোর্ট,
যার অনুমতির ওপরে নির্ভর করে
মানুষটি আজ রাতে হাসপাতালে যেতে পারবে কি না,
কিংবা দেশের বাড়িতে মায়ের মৃত্যুসংবাদ শুনে ছুটে যাওয়ার ছাড়পত্র পাবে কি না।
স্বাধীনতার সংজ্ঞা যারা বইয়ের পাতায় লেখে,
তারা কোনোদিন ভিসার মেয়াদের দিকে তাকিয়ে দিন গোনেনি।
মেয়াদ যখন ফুরিয়ে আসতে থাকে,
তখন বাতাস ভারী হয়ে ওঠে আতঙ্কে।
কোম্পানি কি নবায়ন করবে? নাকি ছুঁড়ে ফেলবে বাতিল জঞ্জালের মতো?
পুলিশের ভ্যান দেখলেই কেন বুক কেঁপে ওঠে?
নিজের রক্তমাংসের শরীরটাকে মনে হয় এক অবৈধ মালপত্র—
যার এই মাটির ওপর হেঁটে যাওয়ার কোনো স্বাভাবিক অধিকার নেই।
আমরা গণতন্ত্র নিয়ে কথা বলি, মানবাধিকারের সনদ মুখস্থ করি।
অথচ এই কাচের শহরের আকাশচুম্বী টাওয়ারগুলোর নিচে
লাখো মানুষ প্রতিদিন নিঃশব্দে বন্দি হয়ে থাকে
শুধু একটি স্ট্যাম্পের ভুলের ভয়ে।
এখানে অপরাধী না হয়েও মানুষ সারাক্ষণ লুকিয়ে বাঁচে,
কথা বলে ফিসফিস করে,
যেন জোরে শ্বাস নিলেও ভিসার শর্ত ভঙ্গ হয়ে যেতে পারে।
একটি কাগজের টুকরো কীভাবে মানুষের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠল?
যে মানুষটা এই শহরের রাস্তা বানাল, সেতু বানাল, কাচের দেওয়াল তুলল—
সেই মানুষটাই আজ সেই কাগজের করুণার ভিখারি।
কাগজের মেয়াদ একদিন শেষ হয়ে যায়,
কিন্তু তার ভেতর আটকে থাকা অপমানের কোনো মেয়াদ থাকে না;
তা আজীবন বয়ে বেড়াতে হয়
এক স্বাধীন দেশের নিঃস্ব ক্রীতদাস হয়ে।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।