চাকা ঘুরলে পথ কমে,
দূরত্ব ছোট হয়ে আসে—বিজ্ঞানের বইয়ে এই নিয়ম লেখা আছে।
কিন্তু এই শহরের যে অদৃশ্য চাকাটি প্রতিদিন ঘোরে,
তা মানুষকে কোথাও পৌঁছে দেয় না;
বরং প্রতি মুহূর্তে তাকে এক অনন্ত শূন্যতার ভেতরে ছুড়ে দেয়।
ভোরের অ্যালার্ম বাজার সাথে সাথে
মানুষ লাফিয়ে ওঠে বিছানা থেকে।
চোখে কোনো স্বপ্ন থাকে না, থাকে কেবল একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের তাড়া।
বাড়িভাড়া, চালের দাম, স্কুলের বেতন, প্রেসক্রিপশনের ওষুধ—
প্রতিটি দিনের গায়ে যেন এক-একটি মূল্যতালিকা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।
মানুষের নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকারটুকুও
আজকাল ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ব্যালেন্সের ওপর নির্ভর করে।
আমরা বলি—টাকা দিয়ে সব কেনা যায় না।
কী অদ্ভুত আত্মপ্রবঞ্চনা!
যে লোকটির পকেটে শেষ বাসের ভাড়া নেই,
যে মা হাসপাতালের বিল দিতে না পেরে সন্তানের মুখের দিকে তাকাতে পারে না—
তাদের সামনে এই বড় বড় দর্শনের কোনো অর্থ থাকে না।
টাকা শুধু কাগজের টুকরো নয়;
টাকা হলো এই নিষ্ঠুর সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর একমাত্র অনুমতিপত্র।
এই চাকাটির কোনো বিরতি নেই।
যে একবার এর ঘূর্ণিতে পা দিয়েছে, সে আর নামতে পারে না।
অসুস্থ শরীরেও ওভারটাইমের টেবিলে বসে থাকা যুবকটি জানে—
একটু থামলেই সে ছিটকে পড়ে যাবে রাস্তার নর্দমায়।
এখানে দয়া নেই, ক্ষমা নেই;
এখানে যে ছুটতে পারে না, তাকে এই চাকা পিষে ফেলে এগিয়ে যায়।
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—
মানুষ ভাবে সে টাকার পেছনে ছুটছে।
অথচ সত্যটা উল্টো;
টাকাই মানুষকে একটি লাঠির মতো তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে আজীবন।
সব হিসেব মেলাতে মেলাতে
একদিন মানুষটার আয়ু ফুরিয়ে যায়।
ব্যাংকের খাতাটা হয়তো বেঁচে থাকে,
কিন্তু যে মানুষটি সেই সংখ্যাগুলোর জন্য নিজের সমগ্র জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল,
তার জন্য মাটিতে কেবল সাড়ে তিন হাত অন্ধকারের বেশি কোনো জায়গা থাকে না।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।