শেকড়ের টান

শেকড়ের টান

- মোঃ আবু তালেব

গাছের শেকড় মাটির নিচে থাকে।
তাকে দেখা যায় না,
কিন্তু ঝড় উঠলে বোঝা যায়—সে কতটা আঁকড়ে ধরেছিল বুক।
মানুষ ভাবে সে স্বাধীন;
সে দেশ ছাড়তে পারে, ভাষা বদলাতে পারে,
বদলে ফেলতে পারে পরনের পোশাক আর চশমার ফ্রেম।
কিন্তু রক্তের ভেতরে যে আদিম মাটির গন্ধ ঘুমিয়ে থাকে,
তাকে কোনো দিন মুছে ফেলা যায় না।

বিদেশের সাজানো সুপারমার্কেটে দাঁড়িয়ে
হঠাৎ যদি কচি লেবুপাতার ঘ্রাণ নাকে লাগে,
মুহূর্তে সমস্ত সাজানো পরিপাটি জীবন চুরমার হয়ে যায়।
চোখের সামনে ভেসে ওঠে—
বর্ষার দিনে ভিজে যাওয়া টিনের চালের অবিরাম ঝমঝম সুর,
উঠোনের কাদায় পিছলে পড়া ভাইবোনের হাসি,
আর গোধূলির আলোয় খড়ের ধোঁয়ায় মিলিয়ে যাওয়া গ্রামের পথ।

এই টান কোনো যুক্তির ধার ধারে না।
যে দেশ তাকে কিছুই দিতে পারেনি—
না নিরাপত্তা, না কাজ, না সম্মানের নিশ্চয়তা;
যে দেশ তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল পরদেশের রাস্তায়—
মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে গেলে
মানুষ অবুঝের মতো সেই দেশের জন্যই কাঁদে।

আমরা কত টাকা খরচ করি আরাম কিনতে।
স্প্রিংয়ের নরম তোশক, সেন্ট্রাল হিটিং, নিখুঁত শীতাতপ।
তবু বুকের কোথাও একটা তীব্র খরা থেকে যায়।
মনে হয়—একটিবার যদি খালি পায়ে
সেই ভাঙা ঘাটের সিঁড়িতে বসা যেত,
যদি একটিবার সেই নদীর পলিমাটি মাখা জল দিয়ে ধুয়ে নেওয়া যেত
এই দীর্ঘ নির্বাসনের সমস্ত ক্লান্তি!

শেকড় কখনো চিৎকার করে না।
সে কেবল গোপনে ভেতরের মানুষকে টানতে থাকে পেছনের দিকে।
মানুষ যত দূরে যায়,
টান তত তীব্র হয়।
আমরা উড়াল দিই ডানায় আকাশ মেপে,
ভাবি কত দূর চলে এসেছি;
অথচ শেষ নিঃশ্বাস নেওয়ার আগে প্রতিটি মানুষ
নিজের অজান্তেই
জন্মের সেই প্রথম ধুলোটুকুর জন্যই হাত বাড়িয়ে দেয়।


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।