কবি ও কাব্য — বাংলা কবিতার অনলাইন সংগ্রহশালা

এরপর অনেকদিন আমাদের কথা হবে না।

একদিন,
দু’জন দু’দিকে মুখ ফিরিয়ে
নিজ নিজ জীবনের ভিড়ে হারিয়ে যাবো আমরা।
তারপর ধীরে ধীরে ভুলে যাবো,
কেমন ছিল তোমার কণ্ঠস্বর,
কথার মাঝখানে হঠাৎ থেমে যাওয়ার অভ্যাসটা,
হাসতে হাসতে শ্বাসকষ্ট হয়ে আসা সেই হাসির শব্দ,
আবৃত্তি করতে গিয়ে কোন উচ্চারণে বারবার ভুল করতে তুমি।

ভুলে যাবো,
কোন কথাগুলো তুমি বেশি বলতে,
কোন কথাগুলো বলতে গিয়েও চুপ করে যেতে।
কোন কথায় তোমার ভীষণ রাগ হতো,
আর কোন কথাটা শুনে
আমি শিশুর মতো খুশি হয়ে উঠতাম।

ভুলে যাবো আমাদের ঘরের আলাপ,
পরের বাড়ির গল্প,
সারাদিনের ছোট ছোট ব্যস্ততা,
অকারণ অভিমান,
অকারণ হাসি,
নিঃশব্দে জমে থাকা কষ্ট।

ভুলে যাবো ট্রেন চলে যাওয়ার শব্দের ভেতর
তোমার সঙ্গে শেষ কথোপকথন,
ফোনটা কেটে দেওয়ার আগে
খুব স্বাভাবিক গলায় বলে ওঠা—
**“ভালো থেকো।”**

অথচ সেই দুটো শব্দের আড়ালে
কত কান্না লুকিয়ে ছিল,
কত কথা বলা হয়নি,
কত কথা বলতে গিয়েও
তুমি থেমে গিয়েছিলে,
কত কথা বলতে গিয়েও
আমি বলতে পারিনি।

একদিন
সেসবও ভুলে যাবো।

দেখা না হতে হতে
একদিন ভুলে যাবো
তুমি দেখতে কেমন ছিলে।

ভুলে যাবো
তোমার গায়ের রঙ,
চুলগুলো কেমন করে কপালের ওপর এসে পড়ত,
গালে সত্যিই কোনো তিল ছিল কি না,
কোথায় ছিল জন্মচিহ্ন,
কেমন ছিল তোমার আঙুল,
নখের আকৃতি,
চোখের সেই অদ্ভুত মায়া,
ঠোঁটের কোণে জমে থাকা
অল্প একটু হাসি।

তোমার হাসিটা ভুলতে ভুলতে
ভুলে যাবো
আমাদের একসঙ্গে হেসে ওঠার দিনগুলো।

বেখেয়ালে হেসে ওঠা,
অকারণে কেঁদে ফেলা,
চোখের জল মুছতে মুছতে
একদিন হয়তো
মুছে ফেলবো আমাদের স্মৃতিগুলোও।

তুমি ভুলে যাবে
কোন শার্টটায় আমাকে সবচেয়ে বেশি সুন্দর লাগত,
আমার মুখে দাঁড়ি ছিল কি না,
চুলগুলো ছোট ছিল নাকি একটু বড়।

আর আমি?

আমি ভুলে যাবো
তোমার প্রিয় পোশাকের রঙ,
তোমার অফিসে যাওয়ার আগে
কপালে টিপ পরতে কিনা,
চুল বাঁধতে তোমার কেমন লাগত,
কোন রঙে তোমাকে সবচেয়ে বেশি সুন্দর দেখাত।

এমনকি একদিন
এতটাই দূরে চলে যাবো আমরা,
যে আয়নায় নিজেদের মুখের দিকে তাকিয়েও
মনে হবে
এই মানুষটাকে কোথায় যেন দেখেছি!

তারপর একদিন
না দেখতে না দেখতে
ভুলে যাবো

আমাদের কখনো দেখা হয়েছিল কি না।

আমাদের আর কিছুই মনে পড়বে না।

শহরের ব্যস্ত রাজপথের মতো
আমাদের বুকও একদিন
পাথর হয়ে যাবে।

যে হৃদয় একসময়
একটা শব্দে কেঁপে উঠত,
একটা নীরবতায় ভেঙে পড়ত,
একটা “ভালো থেকো”-তে
সারারাত কাঁদত,

সেই হৃদয়ই একদিন
কিছুতেই আর কাঁদবে না।

ক্ষুধা,
অনিদ্রা,
শোক,
অভিমান,
অপেক্ষা
কিছুই আর আমাদের ক্লান্ত করবে না।

আমরা ধীরে ধীরে
যান্ত্রিক মানুষ হয়ে যাবো।
ঘুম থেকে উঠবো,
কাজে যাবো,
ফিরে আসবো,
খাবো,
ঘুমাবো।

তারপর আবার
একই জীবন।

শুধু কোথাও,
খুব গভীরে,
আমাদের পুরোনো আমিটা
নিঃশব্দে পড়ে থাকবে।

আমরা ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে
নিজেদের একাকীত্বকে মেনে নেবো,
আবার কোনো কোনো রাতে
ঈশ্বরকেই দোষ দেবো।

দোষ দেবো ভাগ্যকে,
সময়কে,
দূরত্বকে,
অথবা নিজেদের।

ভাগ্যকে তিরস্কার করতে করতে
নিজেদের ভেতরের অদ্ভুত কৌতূহলগুলো
খুঁজে বেড়াবো।

কেন এসেছিলে?
কেন এত কাছে এসেছিলে?
কেন এতটা আপন হয়েছিলে?
যদি শেষ পর্যন্ত
চলে যেতেই হয়?

যেহেতু তুমি
পড়ে ফেলেছো তোমার সমূহ ভবিষ্যৎ,
যেহেতু তুমি
ছুড়ে ফেলেছো আমাদের বিবর্ণ অতীত,
আর আমিও জেনে গেছি—

ভাগ্য নয়,
কেবল ইচ্ছাশক্তিই ধ্রুব।

তবু কী আশ্চর্য,
আমাদের সমস্ত ইচ্ছাশক্তি
একদিন এসে হেরে যাবে
দূরত্বের কাছে।

আমরা কাছে এসেছিলাম
শুধু দূরে সরে যাওয়ার জন্য।

আমরা ভালোবেসেছিলাম
শুধু ভালোবাসা যে
চিরকাল থাকে না,
সেটা জানার জন্য।

আমরা কেউ কারো হতে পারিনি।

অথবা,
হয়তো কোনোদিন
আমরা কেউ কারো ছিলামই না।

তবুও কেন জানি
তোমাকে হারানোর পরও
মনে হবে,
আমার ভেতরের সবচেয়ে সুন্দর একটা অংশ
তোমার কাছেই রেখে এসেছি।

তারপরও জীবন চলবে।

অনেক বছর পর
হয়তো কোনো এক বৃষ্টির রাতে
হঠাৎ কোনো গান বাজবে,
কোনো পরিচিত গন্ধ ভেসে আসবে,
কোনো অচেনা মানুষের হাসিতে
তোমার হাসির মতো কিছু একটা শুনবো।

এক মুহূর্তের জন্য
বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠবে।

মনে হবে,
কোথায় যেন একটা মানুষ ছিল।

খুব আপন।

খুব কাছের।

যার সঙ্গে
অসংখ্য রাত কথা বলেছি,
যার নীরবতাও বুঝেছি,
যার অভিমান ভাঙাতে
নিজের অহংকারটুকুও সরিয়ে রেখেছি।

কিন্তু মনে করতে পারবো না
তার নাম।

মনে করতে পারবো না
তার মুখ।

মনে করতে পারবো না
সে আমাকে কী নামে ডাকতো।

শুধু বুকের ভেতর
অকারণ একটা শূন্যতা জন্ম নেবে।

আর আমি বুঝতেও পারবো না,
সেই শূন্যতার নাম
তুমি।

কারণ

একদিন সবকিছু ভুলে যেতে যেতে
আমি ভুলে যাবো
তোমাকে।

তুমি ভুলে যাবে
আমাকে।

আমরা ভুলে যাবো
আমাদের কথা,
আমাদের হাসি,
আমাদের কান্না,
আমাদের অপেক্ষা,
আমাদের অভিমান,
আমাদের অসমাপ্ত কথাগুলো।

সবশেষে,

ভুলে যাবো
আমি আমাকে।

আর

তুমি তোমাকে।

তবুও কোথাও,
সময় আর স্মৃতির ধ্বংসস্তূপের নিচে,
দু’জন অচেনা মানুষের মতো
চিরকাল পড়ে থাকবে—

আমাদের একদিন
খুব ভালোবাসা হয়েছিল।

ভুলে যাবো

ফাইল চাপা দেওয়া কাচের টেবিলে
রক্ত কোনো শব্দ করে না।
এখানকার নিস্তব্ধ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত করিডোরে
সাইরেনের চিৎকার ঢোকে না,
কোনো বুলেটের ধাতব শিষ এখানে এসে পৌঁছায় না;
কেবল একটা দামি ঝরনা কলমের নিব
সামান্য ঘষে যায় কাগজের ওপর,
আর রাজপথে ছিটকে পড়ে
আরেকটা আঠারো বছরের তাজা মগজ।

তোমরা যাকে বলো ‘প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত’
কিংবা ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষা’,
তার উল্টো পিঠে আসলে লেখা থাকে
কত রাউন্ড তাজা সীসা
আর কত ব্যারেল বিষাক্ত গ্যাস বরাদ্দ হলো
খালি বুকের জন্য।
তোমরা লাল ফিতার বাঁধনে শুধু ফাইল আটকাওনি;
আটকে রেখেছ একটা
গোটা মানচিত্রের মুক্ত নিঃশ্বাস।
স্পেশাল ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতির ফাইল আর
সরকারি বরাদ্দের প্রতিটি স্বাক্ষরের নিচে
চাপা পড়ে আছে একটি করে পরিবারের
সারাজীবনের কান্না।

এখানে কোনো ঘাতক হেলমেট পরে ঘোরে না;
তারা ফিটফাট স্যুট পরে, টাই বাঁধে,
আর শান্ত মুখে ফাইলে চোখ বোলাতে বোলাতে
বৈধতা দিয়ে দেয় মধ্যরাতের কাফনহীন দাফনকে।
তোমরা ভেবেছ সরাসরি ট্রিগারে আঙুল না রাখলে
হাতে রক্তের দাগ লাগে না?
ভুল!
যে কলম খুনির পেছনে বাজেট অনুমোদন করে,
যে সিলমোহর নরমেধের খবরকে
‘গুজব’ বলে ধামাচাপা দেয়—
সেই দোয়াত আসলে একটি আস্ত কসাইখানার
গোপন রিজার্ভার।

এই বহুতল ভবনের ভারী কাচ ভেদ করে
তোমরা জনতাকে দেখতে পাও না;
তোমরা কেবল ক্ষমতা আর
সুযোগের অঙ্কে নিজেদের মেপে নাও।
অথচ তোমরা ভুলে গেছ—
টেবিলের ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখা
সাজানো নথিপত্র দিয়ে
মাটিতে মিশে যাওয়া রক্তের উত্তাপ
কোনোদিন ঠান্ডা করা যায় না।

যেদিন এই দুর্ভেদ্য সচিবালয়ের
সব তালা ভেঙে পড়বে,
সেদিন আর লাল ফিতার গিঁট
তোমাদের অপরাধ ঢাকতে পারবে না।
প্রতিটি ফাইলের পাতা থেকে সেদিন ঠিকরে বের হবে
মর্গের সেই বরফহীন বাতাস,
আর তোদের আরামদায়ক চেয়ারগুলোর দিকে তাকিয়ে
ইতিহাস রায় দেবে—
এরা কেউ প্রশাসক ছিল না,
এরা ছিল প্রকাশ্য এক গণহত্যার
শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কারিগর।

বধ্যভূমির নাম সচিবালয়

সাইরেনের কর্কশ শব্দে তোমরা ভেবেছিলে
শহরটা এক নিমেষে বোবা হয়ে যাবে।
মাইকে সান্ধ্য আইনের ফরমান জারি করে ভেবেছিলে—
জানালার ওপাশে ভয় পেয়ে নিভে যাবে
একটা আস্ত জাতির হৃৎস্পন্দন।

কারফিউ তো কোনো শক্তির প্রতীক নয়;
ওটা আসলে কাঁপতে থাকা মসনদের এক
প্রকাশ্য ভীরুতার দলিল।
তোমরা রাজপথকে ভয় পাও,
খালি পায়ের শব্দকে ভয় পাও,
এমনকি অন্ধকার গলিতে
দেশলাইয়ের এক চিলতে আলো জ্বলে উঠলেও
তোমাদের সাঁজোয়া গাড়ির তলা কেঁপে ওঠে আতঙ্কে।

তোমাদের ওই সিলমোহর দেওয়া
রক্তমাখা নিষেধাজ্ঞার মুখে
আজ একদলা তাজা থুতু ছুড়ে ফেলে
রাজপথে নেমে এসেছে অবাধ্য তারুণ্য।
তাদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই;
আছে শুধু বুলেটের দিকে সরাসরি তাকানোর মতো
এক অদম্য ঘৃণা।
তোমরা যাদের ‘উচ্ছৃঙ্খল’ বলে
রাতের আঁধারে শিকার করতে চাও,
তারা আসলে তোমাদের চেয়ে
হাজার গুণ বেশি চেনে এই মাটির ঘ্রাণ।

সান্ধ্য আইনের কালো চাদর বিছিয়ে
তোমরা ঢাকতে চেয়েছিলে দিনের হত্যাযজ্ঞ।
ভেবেছিলে রাত নামলে ড্রেনের পানিতে ধুয়ে
সাফ করা যাবে মগজ আর রক্ত,
ভ্যানে তুলে গোপনে বেওয়ারিশ কবরে চালান করে
দেওয়া যাবে সত্যের লাশ।
কিন্তু তোমরা বোকার মতো ভুলে গেছ—
প্রতিটি বন্ধ জানালার পেছনে আজ জেগে আছে
একেকটি জ্বলন্ত চোখ,
প্রতিটি বারান্দা আজ রূপ নিয়েছে এক একটি
অতন্দ্র সাক্ষীর পাহারা চৌকিতে।

কাগজে লিখে রাত নামানো যায়,
কিন্তু ভোর আটকে রাখার মতো কোনো আইন
আজও তৈরি হয়নি।
তোমাদের জারি করা এই নিস্তব্ধতার বুক চিরে
কাল সকালেই আছড়ে পড়বে
লাখো মানুষের রুদ্র পদধ্বনি।
তখন এই কাগুজে কারফিউ
আর সাঁজোয়া ব্যারিকেড
খড়কুটোর মতো ভেসে যাবে জনতার এক ফুঁয়ে।

সান্ধ্য আইনের মুখে থুতু

চোখের ওপর বাঁধা যে কালো কাপড়টি ছিল
নিরপেক্ষতার প্রতীক,
তোমরা তাকে বানিয়ে নিয়েছ
অন্ধ দাসত্বের এক নির্লজ্জ মুখোশ।
তোমাদের এজলাসে এখন আর
ন্যায়ের পরিমাপ হয় না;
ওখানে কাঠের হাতুড়ির প্রতিটি আঘাতে
আসলে একটা করে সত্যের কপালে
পেরেক ঠুকে দেওয়া হয়।

দাঁড়িপাল্লার এক পাল্লায় তোমরা তুলে দিয়েছ
শাসকের অহংকার আর ক্ষমতার খাম,
আর অন্য পাল্লায় ঝুলছে
চব্বিশ বছরের এক তরুণের তাজা রক্ত।
তোমাদের হাত কাঁপে না
যখন সাজানো বয়ানে চোখ বুলেটের পক্ষে সই করো,
অথচ রাতের আঁধারে তুলে আনা
নিরপরাধ যুবকের রিমান্ড মঞ্জুর করতে
তোমাদের কলম এক মুহূর্তের জন্যও থমকে দাঁড়ায় না!

যে লাল সালু দিয়ে তোমরা এই বিক্রি হয়ে যাওয়া
বেদী ঢেকে রেখেছ,
তা কোনো পবিত্রতার প্রতীক নয়—
ওটা স্বৈরাচারের বর্বরতাকে আড়াল করে রাখা
এক রক্তমাখা চাদর।
তোমরা ধারার ফাঁকফোকর খোঁজো,
অনুচ্ছেদের ছাই ঘাঁটো;
অথচ ভুলে যাও—
আইন যখন জল্লাদের বর্ম হয়ে ওঠে,
তখন সেই আদালত আর ন্যায়ের মন্দির থাকে না;
তা পরিণত হয় এক সিলমোহরযুক্ত কসাইখানায়।

তোমরা ভেবেছ কালো কোটের আড়ালে সারা জীবন
এই অপরাধ লুকিয়ে রাখা যাবে?
ভেবেছ পদোন্নতির লোভ আর
রাজকীয় দাক্ষিণ্যের বিনিময়ে
ইতিহাসের চোখেও তোমরা
আইন বিশেষজ্ঞ হয়ে টিকে থাকবে?
না।
আদেশপত্রে শুকিয়ে যাওয়া কালির চেয়ে
মানুষের বুকের ক্ষতের আয়ু অনেক বেশি।

আজ তোমরা এজলাসে বসে যে রায় লিখে যাচ্ছ,
কাল জনতার প্রকাশ্য আদালতে
ঠিক সেই কাগজগুলোই তোমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবে।
সেদিন কোনো প্রিভিলেজ তোমাদের বাঁচাতে পারবে না,
কোনো সাজানো নজিরের আড়ালে
মুখ লুকানোর জায়গা থাকবে না।
বিচারক যখন নিজেই ঘাতকের সহযোগী হয়ে ওঠে,
তখন ইতিহাস তার রায় লেখে
কাঠগড়া ভেঙে চুরমার করে।

অন্ধ বিচারকের লাল সালু

বাছাইকৃত কবিতা

মুগ্ধ বিষন্নতা

- মেহেদী হাসান আইয়ুশ

প্রেমিকার অন্যত্র বিয়ে হয়ে যাবার পর সে আরো সুন্দরী হয়ে উঠলো
সন্তানের মা হবার পরে আরও বেশী;
যদিও তার দিকে ওভাবে তাকানোর ফুসরত হয়নি কখনো!

ইদানিং জ্বলে পুড়ে যাই প্রতিরাতে;
হিংসা ক্ষোভ কিংবা আক্ষেপে নয়
একরাশ মুগ্ধতার বিষন্নতায়;

আমার পঞ্চম মৃত্যু বার্ষিকীতে তার সাথে আরেকবার দ্যাখা হ'লে
বিশ্ব সুন্দরীদের সাড়িতে সে বসে ছিলো;
তার প্রতিটি হাসিতে কয়েকজনকে খুন হতে দেখেছিলাম সেদিন,
যাদের বেশিরভাগই ছিলেন সাতাশোর্ধো কিশোর।

....ম'রে যাবার সময় আমি বাইশে ছিলাম।
বিস্তারিত...

ভুলে যাবো

- মেহেদী হাসান আইয়ুশ

এরপর অনেকদিন আমাদের কথা হবে না।

একদিন,
দু’জন দু’দিকে মুখ ফিরিয়ে
নিজ নিজ জীবনের ভিড়ে হারিয়ে যাবো আমরা।
তারপর ধীরে ধীরে ভুলে যাবো,
কেমন ছিল তোমার কণ্ঠস্বর,
কথার মাঝখানে হঠাৎ থেমে যাওয়ার অভ্যাসটা,
হাসতে হাসতে শ্বাসকষ্ট হয়ে আসা সেই হাসির শব্দ,
আবৃত্তি করতে গিয়ে কোন উচ্চারণে বারবার ভুল করতে তুমি।

ভুলে যাবো,
কোন কথাগুলো তুমি বেশি বলতে,
কোন কথাগুলো বলতে গিয়েও চুপ করে যেতে।
কোন কথায় তোমার ভীষণ রাগ হতো,
আর কোন কথাটা শুনে
আমি শিশুর মতো খুশি হয়ে উঠতাম।

ভুলে যাবো আমাদের ঘরের আলাপ,
পরের বাড়ির গল্প,
সারাদিনের ছোট ছোট ব্যস্ততা,
অকারণ অভিমান,
অকারণ হাসি,
নিঃশব্দে জমে থাকা কষ্ট।

ভুলে যাবো ট্রেন চলে যাওয়ার শব্দের ভেতর
তোমার সঙ্গে শেষ কথোপকথন,
ফোনটা কেটে দেওয়ার আগে
খুব স্বাভাবিক গলায় বলে ওঠা—
**“ভালো থেকো।”**

অথচ সেই দুটো শব্দের আড়ালে
কত কান্না লুকিয়ে ছিল,
কত কথা বলা হয়নি,
কত কথা বলতে গিয়েও
তুমি থেমে গিয়েছিলে,
কত কথা বলতে গিয়েও
আমি বলতে পারিনি।

একদিন
সেসবও ভুলে যাবো।

দেখা না হতে হতে
একদিন ভুলে যাবো
তুমি দেখতে কেমন ছিলে।

ভুলে যাবো
তোমার গায়ের রঙ,
চুলগুলো কেমন করে কপালের ওপর এসে পড়ত,
গালে সত্যিই কোনো তিল ছিল কি না,
কোথায় ছিল জন্মচিহ্ন,
কেমন ছিল তোমার আঙুল,
নখের আকৃতি,
চোখের সেই অদ্ভুত মায়া,
ঠোঁটের কোণে জমে থাকা
অল্প একটু হাসি।

তোমার হাসিটা ভুলতে ভুলতে
ভুলে যাবো
আমাদের একসঙ্গে হেসে ওঠার দিনগুলো।

বেখেয়ালে হেসে ওঠা,
অকারণে কেঁদে ফেলা,
চোখের জল মুছতে মুছতে
একদিন হয়তো
মুছে ফেলবো আমাদের স্মৃতিগুলোও।

তুমি ভুলে যাবে
কোন শার্টটায় আমাকে সবচেয়ে বেশি সুন্দর লাগত,
আমার মুখে দাঁড়ি ছিল কি না,
চুলগুলো ছোট ছিল নাকি একটু বড়।

আর আমি?

আমি ভুলে যাবো
তোমার প্রিয় পোশাকের রঙ,
তোমার অফিসে যাওয়ার আগে
কপালে টিপ পরতে কিনা,
চুল বাঁধতে তোমার কেমন লাগত,
কোন রঙে তোমাকে সবচেয়ে বেশি সুন্দর দেখাত।

এমনকি একদিন
এতটাই দূরে চলে যাবো আমরা,
যে আয়নায় নিজেদের মুখের দিকে তাকিয়েও
মনে হবে
এই মানুষটাকে কোথায় যেন দেখেছি!

তারপর একদিন
না দেখতে না দেখতে
ভুলে যাবো

আমাদের কখনো দেখা হয়েছিল কি না।

আমাদের আর কিছুই মনে পড়বে না।

শহরের ব্যস্ত রাজপথের মতো
আমাদের বুকও একদিন
পাথর হয়ে যাবে।

যে হৃদয় একসময়
একটা শব্দে কেঁপে উঠত,
একটা নীরবতায় ভেঙে পড়ত,
একটা “ভালো থেকো”-তে
সারারাত কাঁদত,

সেই হৃদয়ই একদিন
কিছুতেই আর কাঁদবে না।

ক্ষুধা,
অনিদ্রা,
শোক,
অভিমান,
অপেক্ষা
কিছুই আর আমাদের ক্লান্ত করবে না।

আমরা ধীরে ধীরে
যান্ত্রিক মানুষ হয়ে যাবো।
ঘুম থেকে উঠবো,
কাজে যাবো,
ফিরে আসবো,
খাবো,
ঘুমাবো।

তারপর আবার
একই জীবন।

শুধু কোথাও,
খুব গভীরে,
আমাদের পুরোনো আমিটা
নিঃশব্দে পড়ে থাকবে।

আমরা ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে
নিজেদের একাকীত্বকে মেনে নেবো,
আবার কোনো কোনো রাতে
ঈশ্বরকেই দোষ দেবো।

দোষ দেবো ভাগ্যকে,
সময়কে,
দূরত্বকে,
অথবা নিজেদের।

ভাগ্যকে তিরস্কার করতে করতে
নিজেদের ভেতরের অদ্ভুত কৌতূহলগুলো
খুঁজে বেড়াবো।

কেন এসেছিলে?
কেন এত কাছে এসেছিলে?
কেন এতটা আপন হয়েছিলে?
যদি শেষ পর্যন্ত
চলে যেতেই হয়?

যেহেতু তুমি
পড়ে ফেলেছো তোমার সমূহ ভবিষ্যৎ,
যেহেতু তুমি
ছুড়ে ফেলেছো আমাদের বিবর্ণ অতীত,
আর আমিও জেনে গেছি—

ভাগ্য নয়,
কেবল ইচ্ছাশক্তিই ধ্রুব।

তবু কী আশ্চর্য,
আমাদের সমস্ত ইচ্ছাশক্তি
একদিন এসে হেরে যাবে
দূরত্বের কাছে।

আমরা কাছে এসেছিলাম
শুধু দূরে সরে যাওয়ার জন্য।

আমরা ভালোবেসেছিলাম
শুধু ভালোবাসা যে
চিরকাল থাকে না,
সেটা জানার জন্য।

আমরা কেউ কারো হতে পারিনি।

অথবা,
হয়তো কোনোদিন
আমরা কেউ কারো ছিলামই না।

তবুও কেন জানি
তোমাকে হারানোর পরও
মনে হবে,
আমার ভেতরের সবচেয়ে সুন্দর একটা অংশ
তোমার কাছেই রেখে এসেছি।

তারপরও জীবন চলবে।

অনেক বছর পর
হয়তো কোনো এক বৃষ্টির রাতে
হঠাৎ কোনো গান বাজবে,
কোনো পরিচিত গন্ধ ভেসে আসবে,
কোনো অচেনা মানুষের হাসিতে
তোমার হাসির মতো কিছু একটা শুনবো।

এক মুহূর্তের জন্য
বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠবে।

মনে হবে,
কোথায় যেন একটা মানুষ ছিল।

খুব আপন।

খুব কাছের।

যার সঙ্গে
অসংখ্য রাত কথা বলেছি,
যার নীরবতাও বুঝেছি,
যার অভিমান ভাঙাতে
নিজের অহংকারটুকুও সরিয়ে রেখেছি।

কিন্তু মনে করতে পারবো না
তার নাম।

মনে করতে পারবো না
তার মুখ।

মনে করতে পারবো না
সে আমাকে কী নামে ডাকতো।

শুধু বুকের ভেতর
অকারণ একটা শূন্যতা জন্ম নেবে।

আর আমি বুঝতেও পারবো না,
সেই শূন্যতার নাম
তুমি।

কারণ

একদিন সবকিছু ভুলে যেতে যেতে
আমি ভুলে যাবো
তোমাকে।

তুমি ভুলে যাবে
আমাকে।

আমরা ভুলে যাবো
আমাদের কথা,
আমাদের হাসি,
আমাদের কান্না,
আমাদের অপেক্ষা,
আমাদের অভিমান,
আমাদের অসমাপ্ত কথাগুলো।

সবশেষে,

ভুলে যাবো
আমি আমাকে।

আর

তুমি তোমাকে।

তবুও কোথাও,
সময় আর স্মৃতির ধ্বংসস্তূপের নিচে,
দু’জন অচেনা মানুষের মতো
চিরকাল পড়ে থাকবে—

আমাদের একদিন
খুব ভালোবাসা হয়েছিল।
বিস্তারিত...

সাম্প্রতিক সংযোজন

শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
রাধা-কৃষ্ণ মোঃ আবু তালেব 4718
চোখের নেশার ভালবাসা মোঃ আবু তালেব 1751
পল্লী স্মৃতি সুফিয়া কামাল 1694
চোখের কাজল মোঃ আবু তালেব 1619
তবে কেন আমি অপরাধী মোঃ আবু তালেব 1604
তোকে নিয়ে… এলোমেলো হাবীব কাশফি 1555
কর্মফল মোঃ আবু তালেব 1546
নবী দ্বীনের রাসুল মোঃ আবু তালেব 1504
রমণী মোঃ আবু তালেব 1468
চাঁদবদনী মোঃ আবু তালেব 1450
জন্মান্তর মোঃ আবু তালেব 1444
পার্থক্য মোঃ আবু তালেব 1440
তোমাকে ভালোবেসে জীবনানন্দ দাশ 1404
ঘুঙুরটা আজ বাজুক জোরে মোঃ আবু তালেব 1401
জরুরী বিষয় মোঃ আবু তালেব 1400
করিব আজ রঙ্গ লীলা মোঃ আবু তালেব 1391
অবিলাষ মোঃ আবু তালেব 1389
রাধা প্রেমের প্রেমিক মোঃ আবু তালেব 1372
 সুপ্ত-প্রিয়া মোঃ আবু তালেব 1364
শ্যাম তোমারে ভালবেসে মোঃ আবু তালেব 1358
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
অন্তহীন সুর (The Endless Melody) মোঃ আবু তালেব 830
আগামীর প্রতিধ্বনি (The Echo of Tomorrow) মোঃ আবু তালেব 809
আমাদের শেষ প্রশ্ন (Our Final Question) মোঃ আবু তালেব 912
আমাদের হয়ে ওঠার ধূলি (The Dust of Our Becoming) মোঃ আবু তালেব 732
সীমান্তের স্রোত মোঃ আবু তালেব 815
কণ্ঠের বিপ্লব মোঃ আবু তালেব 860
বিপ্লবের বৃষ্টি মোঃ আবু তালেব 836
সীমান্তের আকাশ মোঃ আবু তালেব 701
তুমি আমার বায়োস্কোপ মোঃ আবু তালেব 826
আমিই বাংলাদেশ মোঃ আবু তালেব 837
জাগরণ মোঃ আবু তালেব 862
শুধু দেখা হলোনা দুজনে মোঃ আবু তালেব 1026
উপদেশ মোঃ আবু তালেব 1028
নীল পেয়ালার কারণবারি মোঃ আবু তালেব 1198
ভেস্ত যেন হাতের মুঠোয় মোঃ আবু তালেব 1126
দুশ্চিন্তা মোঃ আবু তালেব 1142
অমরত্বের স্বপ্নে বিভোর মোঃ আবু তালেব 1115
অপেক্ষার শেষদিন-২ মোঃ আবু তালেব 1118
অপেক্ষার শেষদিন-১ মোঃ আবু তালেব 1243
নবী দ্বীনের রাসুল মোঃ আবু তালেব 1504
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে
মুগ্ধ বিষন্নতা মেহেদী হাসান আইয়ুশ 5
ভুলে যাবো মেহেদী হাসান আইয়ুশ 6
সিজার আফজাল সুয়েব 30
আল্লাহু আল্লাহু সুলাইমান সিরাজ 36
সে কখনো চিঠি লেখেনি মেহেদী হাসান আইয়ুশ 35
পৃথিবী সুস্থ হলে মেহেদী হাসান আইয়ুশ 31
তুমুল সন্ন্যাসী হতে হতে মেহেদী হাসান আইয়ুশ 31
এসো ফিরে কবি সমুদ্র দাস 40
বৃত্তের বাইরে আফজাল সুয়েব 66
অনন্ত ধ্রুবক মোছাঃ লুবা আক্তার 76
বৃষ্টি ও ছাতার কথোপকোথন Md. Mustafizur Rahman 66
কর্পোরেট কালচার Md. Mustafizur Rahman 77
শব্দের সুনামি Md. Mustafizur Rahman 76
এ শহর আমার নয় Md. Mustafizur Rahman 83
বায়তুল মাক্বদিস ফেরদাউস সরকার 96
কবির কলমে নবির ছবি কবি ফেরদাউস সরকার 94
প্রত্যাবর্তন রাফাত আহমেদ 92
মৃত্যুদিন শ্রীমল্লার 112
কাঁটাতার ফেরদাউস সরকার 141
তোমাকেই বলছি হে ভারত! ফেরদাউস সরকার 101
শিরোনাম কবি পঠিত হয়েছে