অচিনপুরে জমানো কান্না

অচিনপুরে জমানো কান্না

- মোঃ আবু তালেব

দিনের বেলা এখানে কান্নার কোনো সময় নেই।
সকালে সাইটের বাস আসে ঠিক পৌনে ছটায়,
তারপর একটানা ড্রিল মেশিনের গর্জন, ক্রেনের ওঠানামা,
আর কড়া রোদে গলতে থাকা অ্যাসফল্টের ধোঁয়া।
চোখে জল আসার আগেই তা শুকিয়ে বাষ্প হয়ে যায় লোনা ঘামের সাথে মিশে।
ফোরম্যানের কর্কশ হাঁকডাকের কাছে কোনো মানুষের ব্যক্তিগত শোকের জায়গা নেই।

কান্নাগুলো তাই জমা করে রাখতে হয় পকেটে—
যেমন করে মানুষ লুকিয়ে রাখে অবৈধ ওভারটাইমের হিসেব কিংবা দেশের চিঠি।
অচিনপুরের এই শহরে কেউ কারও ব্যথার কথা শুনতে চায় না;
এখানে যে যার নিজের খাঁচা সামলাতেই ব্যস্ত।
একজনের চোখের দিকে তাকিয়ে অন্যজন বুঝে ফেলে—
বেশি কথা বললে নিজের ভেতরের বাঁধটাও ভেঙে পড়তে পারে।

রাত যখন নামে,
আটজনের মেসবাড়িতে যখন একে একে সবাই ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে,
তখন একলা মানুষটি বাথরুমে গিয়ে ট্যাপের জলটা পুরো খুলে দেয়।
জলের একটানা শব্দের আড়ালে
বুকের ভেতর এতদিনের জমে থাকা পাথরগুলো
একটু একটু করে গলতে শুরু করে।
সেখানে কোনো চিৎকার নেই, কোনো বিলাপ নেই—
শুধু নোনতা জল গড়িয়ে পড়ে অচেনা দেশের ঠান্ডা বেসিনে।

মা মারা যাওয়ার খবরটা যখন এসেছিল,
তখনও ছুটি মেলেনি।
ইকামা আটকে ছিল কফিলের ড্রয়ারে,
আর টিকিটের দাম হয়ে উঠেছিল সাধ্যের অতীত।
সেই থেকে বুকের ভেতর একটা আস্ত গোরস্থান বয়ে নিয়ে বেড়ায় মানুষটি;
অথচ বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়—সে কেবল কাজ করে যাওয়া এক সচল রোবট।

অচিনপুরের বাতাস বড় বেশি নির্মম।
সে মানুষের রক্ত শুষে নেয়, ঘাম শুষে নেয়,
কিন্তু তার কান্নার কোনো সাক্ষ্য সে রাখে না।
হাজার মাইল দূরের মাটিতে যে নোনাজল ঝরে পড়ল নিঃশব্দে,
দেশের উঠোনের ধুলো কোনোদিন জানতেও পারবে না—
তাদের ঘর পাকা করার জন্য
কতটা চোখের জল ভিনদেশি ড্রেনে প্রতিদিন হারিয়ে গেছে।


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।