এয়ারপোর্টের কাচের দেয়াল

এয়ারপোর্টের কাচের দেয়াল

- মোঃ আবু তালেব

দুটো জগৎকে আলাদা করার জন্য
কোনো কাঁটাতার বা পরিখার দরকার হয়নি।
একটি নিরেট, স্বচ্ছ কাচের দেয়ালই যথেষ্ট।
এতটাই পরিষ্কার সেই কাচ—
যেন ওপাশে হাত বাড়ালেই মানুষটাকে ছোঁয়া যাবে;
অথচ এই কয়েক মিলিমিটার পুরু কাচের ব্যবধান
আসলে কয়েক হাজার মাইলের চেয়েও বেশি দুর্লঙ্ঘ্য।

কাচের এপাশে দাঁড়িয়ে আছে এক দল ক্লান্ত শরীর।
হাতে ভারী ট্রলি ব্যাগ, বুকের ভেতর চেপে রাখা পাসপোর্ট,
আর চোখে এক অজানা দেশের ভয়।
তারা জানে—এই ইমিগ্রেশনের দরজাটা পার হওয়া মানেই
নিজের ফেলে আসা শৈশব, অধিকার আর ভাষার স্বাধীনতাকে
বাইরের ডাস্টবিনে ফেলে রেখে যাওয়া।

আর কাচের ওপাশে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে কিছু চোখ।
মা, যার আঁচলটা বারবার মুখে উঠছে চোখের জল ঢাকতে;
তরুণী স্ত্রী, যে ভিড়ের লজ্জায় চিৎকার করে কাঁদতে পারছে না;
আর অবুঝ সন্তান, যে কাচের ওপর ছোট ছোট দুটি হাত রেখে
বাবার আঙুল স্পর্শ করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।

সেখানে কোনো শব্দ ওপার থেকে এপারে আসে না।
ভেতরের মানুষটি দেখতে পায় ঠোঁটের নড়াচড়া—
‘ভালো থেকো,’ ‘নিজের খেয়াল রেখো,’ ‘পৌঁছে ফোন দিও।’
শব্দহীন সেই সিনেমা এত করুণ, এত নগ্ন,
যে মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত বোবা মানুষের আর্তনাদ
আজ এই কাচের গায়ে এসে আছড়ে পড়ছে।

এই দেয়াল কোনো স্থাপত্যের শিল্প নয়;
এ হলো এই দরিদ্র ভূখণ্ডের তৈরি এক নিঃশব্দ কসাইখানা।
যেখানে প্রতিদিন শত শত যুবক নিজের রক্তমাংসের শরীরটাকে
দেশান্তরী করার জন্য বলি দিয়ে যায়।

কাচের ওপর আঙুলের ছাপগুলো কিছুক্ষণ বাদে মুছে দেয় পরিচ্ছন্নতাকর্মী।
কাচ আবার ঝকঝকে, চকচকে হয়ে ওঠে।
শুধু রয়ে যায় সেই অদৃশ্য রক্তের দাগ—
যা কোনোদিন কোনো যন্ত্র দিয়ে ধুয়ে ফেলা সম্ভব নয়।


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।