জন্মভূমি কোনো পোস্টার নয়।
না কোনো জাতীয় সংগীতের মুখস্থ পঙক্তি,
না মানচিত্রের কাঁটাতারে ঘেরা এক টুকরো জমি।
জন্মভূমি হলো এমন এক গভীর ঋণ—
যা শোধ করতে গিয়ে মানুষ আজীবন নিঃস্ব হয়,
অথচ কোনোদিন মুক্তি পায় না।
সে থাকে ধানের গন্ধমাখা ভেজা বাতাসে,
বাবার পুরোনো সাইকেলের চেইনের ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে,
আর মায়ের হাতের পোড়া তেলের পিঠার স্বাদে।
অথচ সেই দেশটাই আবার
নিজের সন্তানকে তাড়িয়ে দেয় বিদেশের মরুভূমিতে,
পাঠিয়ে দেয় সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে প্লাস্টিকের নৌকায়—
একটু বেঁচে থাকার খোঁজে।
বিমানবন্দরের কাচঘেরা করিডোরে দাঁড়িয়ে
যে ছেলেটি শেষবার পেছনে তাকায়,
তার ব্যাগে থাকে পাসপোর্ট, কাজের ভিসা আর কিছু শুকনা খাবার।
কিন্তু বুকের ভেতর সে বয়ে নিয়ে যায়
কাদার ওপর খালি পায়ে হেঁটে যাওয়ার স্মৃতি।
বিদেশে গিয়ে সে বহুতল ভবন বানায়, রাস্তা সাফ করে, রক্ত জল করে ডলার পাঠায়;
আর সেই টাকায় দেশে গড়ে ওঠে আরও কিছু বিলাসী দালান,
যার গেটে তার মতো শ্রমিকের ঢোকার কোনো অধিকার থাকে না।
রাজনীতির মঞ্চে জন্মভূমিকে নিয়ে কত স্লোগান ওঠে!
কত রক্ত, কত পতাকা, কত ক্ষমতার হাতবদল।
অথচ থানার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা নিঃস্ব কৃষকটির কাছে
দেশ মানে শুধুই এক দীর্ঘ লাঞ্ছনা,
হাসপাতালের বেডে বিনা চিকিৎসায় মরতে থাকা মায়ের কাছে
দেশ মানে শুধুই এক নিস্তব্ধ অবহেলা।
তবু মানুষ এই মাটির দিকেই ফিরে তাকায়।
দূরে গেলে তার বুক পোড়ে, কাছে এলে তার পিঠ ভেঙে যায়।
জন্মভূমি আসলে সেই নিষ্ঠুর জননী—
যে সন্তানকে দুহাত ভরে ভালোবাসতে পারে না ঠিকই,
কিন্তু অন্য কোনোখানে তাকে পুরোপুরি শান্তিতে ঘুমোতেও দেয় না।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।