মানচিত্রে নদী কেবল একটা নীল রেখা।
ভূগোলের বইয়ে তার উৎস আর মোহনার দৈর্ঘ্য লেখা থাকে,
লেখা থাকে সে কত কিউসেক জল বয়ে নিয়ে যায় বঙ্গোপসাগরে।
অথচ এই রেখাটির নিচে
কবর হয়ে আছে কত শত মানুষের ভিটেমাটি,
তার কোনো পরিসংখ্যান কোনো মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ে না।
নদী কোনো গান গায় না;
নদী হলো এই দেশের সবচেয়ে বড় ডাকাত,
আবার সবচেয়ে দয়ালু পিতা।
যে মাটিতে সে আজ পলি ফেলে সোনার ধান ফলায়,
কাল রাতেই সেই মাটির বুক চিরে
বাপ-দাদার কবর আর উঠোনের তুলসীতলাটাকে
এক নিমেষে গিলে ফেলে নিঃশব্দে।
ভাঙন দেখার জন্য কোনো দূরবীন লাগে না।
ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা বুড়ো মানুষটির মুখের বলিরেখা দেখলেই বোঝা যায়—
একটি নদী কীভাবে মানুষের সমগ্র পরিচয়কে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
যে মানুষটির সকালে দশ বিঘা জমি ছিল,
সন্ধ্যায় সে লঞ্চের ডেকে বসে থাকে একলা শরণার্থীর মতো—
হাতে কেবল একটা পুরোনো টিনের ট্রাঙ্ক,
আর ভেতরে একমুঠো ভিজে যাওয়া স্মৃতি।
শহরের ড্রেনগুলোও তো একসময় নদী ছিল।
মানুষ নিজের প্রয়োজনে তাদের শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলেছে,
বুকে ঢেলে দিয়েছে কারখানার বিষাক্ত কালো বর্জ্য।
অথচ সেই নদীই যখন বর্ষায় ফুঁসে ওঠে,
শহরের পিচঢালা রাজপথকে ভাসিয়ে দিয়ে মনে করিয়ে দেয়—
কাগজের দলিলে মালিকানা লেখা যায়,
কিন্তু মাটির আদিম প্রবাহকে কোনোদিন খাঁচায় বন্দি করা যায় না।
নদী আসলে কোনো জলধারা নয়;
নদী হলো বাংলাদেশের এক বহমান ক্ষত।
সে মানুষকে বারবার উদ্বাস্তু করে,
আবার সেই মানুষকেই বাধ্য করে
তারই কূলঘেঁষে নতুন করে খড়কুটোর ঘর বাঁধতে।
যেন নিয়তি আর মানুষের এই অনন্ত লড়াইয়ে
জেতার কোনো শেষ নেই,
হারারও কোনো ক্লান্তি নেই।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।