পাঠক মুগ্ধ হয়ে ভাবে—কবি বুঝি এই মাটির মানুষ নন।
তিনি নিশ্চয়ই কোনো দূরবর্তী মেঘের ওপারে বসবাস করেন;
সকালে অলংকারের রস আস্বাদন করে দিন শুরু করেন,
বিকেলে বাতাসের সঙ্গে দার্শনিক সংলাপে বসেন,
আর রাতে চাঁদের আলোয় স্নান সেরে রূপকথার ঘুমে তলিয়ে যান।
লোকে বিশ্বাসই করতে চায় না—একজন কবিরও পেট কামড়াতে পারে ক্ষুধার জ্বালায়,
একজন কবিরও চটি জুতো ক্ষয়ে গিয়ে পিচের গরম রাস্তায় পা পুড়তে পারে।
অথচ কবির পড়ার টেবিলটার দিকে যদি কেউ একবার সাহস করে তাকাত—
তবে দেখতে পেত, সদ্য লেখা কবিতার ধারালো পাণ্ডুলিপির ঠিক নিচেই
চাপা পড়ে আছে বিদ্যুৎ বিলের লাল কালিতে লেখা চূড়ান্ত তাগাদা।
খাতার ভাঁজে লুকানো আছে সন্তানের স্কুলের ফি দেওয়ার জন্য
কোনো এক স্বচ্ছল বন্ধুর কাছে ধার চেয়ে পাঠানো অনুত্তর খুদেবার্তা।
যে মানুষটা গতকাল সন্ধ্যায় আলো ঝলমলে মঞ্চে দাঁড়িয়ে
বজ্রকণ্ঠে উচ্চারণ করে এলেন—‘মাথা নত না করার স্পর্ধা’,
আজ সকালেই তাকে লোকাল বাসের পাদানিতে দাঁড়িয়ে
পাঁচ টাকার খুচরা ভাড়ার জন্য কন্ডাক্টরের অপমান মুখ বুজে হজম করতে হয়েছে।
তাঁর সহধর্মিণী যখন চালের খালি ড্রামটার ওপর হাত রেখে
এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজার দিকে চেয়ে থাকেন—
তখন পৃথিবীর কোনো দুর্লভ উপমা দিয়ে সেই ক্ষুধার্ত দৃষ্টির অনুবাদ করা যায় না।
ছন্দ দিয়ে কোনোদিন সংসারের ফুটো চাল চুইয়ে পড়া বৃষ্টির পানি ঠেকানো যায় না।
সমাজ ভাবতেই পারে না, যে মানুষটা লক্ষ মানুষকে স্বপ্ন দেখাতে পারে,
সে নিজের ঘরে ফিরে এক টুকরো ঘুমের বড়ির জন্য কত অসহায় হয়ে পড়ে।
লোকে ভাবে—কবি খুব রহস্যময়, খুব দূরত্ব বজায় রেখে চলেন।
তারা জানে না, কবি আসলে পালিয়ে বেড়ান এই ভয়ে—
পাছে কেউ তাঁর জামার ছেঁড়া কলারটা দেখে ফেলে!
পাছে এই শহর জেনে যায়—যে কবি সারা জাতিকে আলোর দিশা দিচ্ছেন,
তাঁর নিজের শোবার ঘরে মাসের শেষ সপ্তাহে এক টুকরো নিরেট অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।
রাত আড়াইটায় যখন সমস্ত কোলাহল থেমে যায়,
স্ত্রী আর সন্তানের পরিশ্রান্ত নিঃশ্বাসের পাশে বসে
কবি যখন কলমের মুখটা নিঃশব্দে আটকে দেন—
ঠিক তখনই সেই অন্ধকার ঘরের মেঝেতে নেমে আসে ‘প্রথম নিরবতা’।
সেই নিরবতা কোনো ছন্দের তোয়াক্কা করে না।
সে কোনো জাতীয় পুরস্কারের পদক নিয়ে সামনে দাঁড়ায় না।
সে কেবল কবির চোখের দিকে তাকিয়ে এক চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়—
তুমি নিজের রক্ত জল করে এক একটি শব্দ দিয়ে
পুরো মানবজাতির জন্য মুক্ত আকাশ তৈরি করতে চেয়েছিলে;
অথচ তোমার নিজের ব্যক্তিগত জীবনটাই চিরদিনের জন্য বন্দি রয়ে গেল—
বাজারের ব্যাগের ওজন আর বাড়িভাড়ার আতঙ্কে পিষ্ট হওয়া
এক চরম একাকী, অসমাপ্ত বাক্যের ভেতর।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।