আবাসিক এলাকার লোহার বড় গেটটিতে পৌঁছালেই
দারোয়ান লাঠি উঁচিয়ে তার পথ আটকে দাঁড়ায়।
কাচের লিফটে পা দেওয়ার কোনো অধিকার তার নেই;
তাকে উঠতে হয় পেছনের অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে সার্ভিস সিঁড়ি দিয়ে।
সে যদি বিনীত ভঙ্গিতে মাথা ঝুঁকিয়ে কাউকে সালাম দেয়,
ভদ্রলোকেরা প্রতিত্তরে একটি শব্দও খরচ করার প্রয়োজন বোধ করেন না।
সমাজ খুব ছোটবেলা থেকেই তার কপালের চামড়ায়
এক অলিখিত সিলমোহর এঁটে দিয়েছে—‘নিচু মানুষ’।
তার কাজ নিচু, তার গায়ের চামড়ার রঙ নিচু,
আর শহরের সবচেয়ে দুর্গন্ধময় গলির শেষ প্রান্তে তার বাসস্থান।
চায়ের দোকানে গেলে তার জন্য আলাদা করে রাখা থাকে একটা কোণ-ভাঙা কাচের গ্লাস;
তার হাত থেকে কোনো কাগজের নোট নেওয়ার সময়
দোকানি সজাগ থাকে—পাছে তার অপবিত্র আঙুলের ছোঁয়া লেগে যায়!
ভদ্র নারীরা তার পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময়
সাদা ওড়না দিয়ে খুব সাবধানে নাক চেপে ধরেন;
যেন তার শরীরের ঘাম এই সভ্যতার সমস্ত কৃত্রিম পারফিউমকে এক নিমেষে নষ্ট করে দেবে।
অথচ এই মানুষটাই প্রতিদিন ভোর চারটায়
যখন গোটা শহর নিশ্চিন্ত ঘুমে মগ্ন থাকে,
তখন এক টুকরো কাপড় কোমরে পেঁচিয়ে নেমে যায়
শহরের বুকসমান বিষাক্ত ম্যানহোলের নর্দমার ভেতর।
যে নোংরা, যে বর্জ্য এই সভ্য নাগরিকেরা
প্রতিদিন নিজেদের পরিপাটি ঘর থেকে নির্দ্বিধায় উগরে দেয়—
সে খালি হাতে সেই নরক পরিষ্কার করে নিজের বুক দিয়ে ঠেলে দেয়;
যাতে সকালবেলা শহরের রাজপথগুলো ঝকঝকে দেখায়,
যাতে বাবুদের চকচকে জুতোর তলায় কোনো দুর্গন্ধ না লাগে।
সে যদি মাত্র দুই দিনের জন্য কাজ বন্ধ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকে,
তবে এই আধুনিক নগরীর সমস্ত আভিজাত্য
চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে নিজেরই বিষ্ঠার দুর্গন্ধে দমবন্ধ হয়ে মারা পড়বে।
সে জীবনে কোনোদিন কোনো মিথ্যার চুক্তিপত্রে সই করেনি।
সে কারও সঞ্চয়ের টাকা লুট করে বিদেশে প্রাসাদ বানায়নি।
তার একমাত্র অপরাধ—সে বেঁচে থাকার জন্য কোনো মুখোশ না পরে
নিজের রক্ত পানি করে এই পৃথিবীর নোংরা পরিষ্কার করেছে।
দিনশেষে যখন সে বস্তির এক চিলতে ভাঙা ঘরে ফিরে আসে,
আর সাবান দিয়ে শতবার হাত ধুয়ে
এক থালা মোটা ভাতের সামনে চুপচাপ বসে—
ঠিক তখনই সেই মলিন মেঝের ওপর নেমে আসে ‘প্রথম নিরবতা’।
সেই নিরবতা কোনো পরাজয় নয়;
ওটা হলো এই কপট সভ্যতার বিরুদ্ধে প্রকৃতির এক চূড়ান্ত রায়।
সেই নিরবতার সামনে দাঁড়িয়ে যদি উচ্চতা মাপা যায়,
তবে স্পষ্ট দেখা যাবে—
যাদের সমাজ ‘উঁচু’ বলে মঞ্চে বসিয়ে রেখেছে,
তারা আসলে মিথ্যার জঞ্জালে দাঁড়িয়ে থাকা একদল ক্ষুদ্র বামন;
আর যাকে এই পৃথিবী আজীবন ‘নিচু মানুষ’ বলে অবহেলা করল,
সে ছিল সমস্ত নোংরাকে নিজের বুকে ধারণ করে এই শহরকে বাঁচিয়ে রাখা
এক বিশাল, অপাপবিদ্ধ অসমাপ্ত বাক্য।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।