শহরের যে কোনো প্রথম সারির অনুষ্ঠানে
তাঁর জন্য সামনের সারির নরম চামড়ার সোফাটি নির্দিষ্ট থাকে।
মঞ্চে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর গলায় পরিয়ে দেওয়া হয়
তাজা রজনীগন্ধার ভারী, সুবাসিত মালা;
আর উপস্থাপক অত্যন্ত বিনম্র কণ্ঠে তাঁর নামের আগে
অজস্র বিশেষণ জুড়ে দিয়ে পরিচয় করিয়ে দেন—‘আমাদের সমাজের আলোকবর্তিকা’।
তিনি যখন হাসেন, তখন সেই হাসিতে কোনো পরিমিতির অভাব থাকে না।
তিনি যখন মাইকের সামনে দাঁড়ান,
তখন তাঁর হাত নাড়ার ভঙ্গিটিতে থাকে এক নিপুণ আভিজাত্য।
সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় পাতায় তাঁর লেখা ছাপা হয় নীতি ও আদর্শ নিয়ে;
টেলিভিশনের গোলটেবিল বৈঠকে তিনি আঙুল উঁচিয়ে
দেশের অধঃপতন নিয়ে দীর্ঘ আক্ষেপ প্রকাশ করেন।
সাধারণ মানুষ দূর থেকে তাঁর গাড়ির কালো কাচের দিকে চেয়ে থাকে ভক্তিতে;
তারা ভাবে—মানুষ যদি হতে হয়, তবে এই লোকটির মতোই হওয়া উচিত।
সমাজ তাঁকে ডাকে—‘সম্মানিত মানুষ’।
কিন্তু এই চকচকে পদবির পেছনের ইতিহাসটা কেউ কোনোদিন পড়ে দেখে না।
কেউ দেখতে চায় না—আজকের এই সম্মানিত মসনদে পৌঁছানোর জন্য
তিনি কতগুলো বিশ্বস্ত বন্ধুর কাঁধের ওপর নির্দয়ভাবে পা ফেলেছিলেন।
যে তরুণটি একদিন তাঁর প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি নিয়ে মুখ খুলতে চেয়েছিল,
তাকে কীভাবে এক রাতের নোটিশে জীবিকাচ্যুত করে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল;
কিংবা যে নদীটা দখল করে তাঁর আধুনিক কারখানার ভিত দাঁড়িয়ে আছে,
সেই পানির নিচে কত হাজার জেলের কান্না চিরদিনের জন্য চাপা পড়ে গেছে—
তার কোনো অডিট রিপোর্ট এই সমাজে কোনোদিন তৈরি হয় না।
তিনি অত্যন্ত চতুর।
তিনি কখনো নিজ হাতে কোনো রক্তপাত ঘটাননি।
তিনি কেবল ক্ষমতার প্রতিটি অন্যায়ের সময়
খুব পরিপাটি ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে নিজের অংশটুকু বুঝে নিয়েছেন;
আর সেই চরম সুবিধাবাদের বিনিময়ে এই শহর
তাঁকে উপহার দিয়েছে সম্মানের এই স্বর্ণপদক।
কিন্তু এই সাজানো সংবর্ধনা চিরস্থায়ী হয় না।
রাত একটা বাজে।
দেহরক্ষী আর স্তাবকদের দল গেটের বাইরে চলে গেছে অনেকক্ষণ আগে।
গলার শুকিয়ে যাওয়া মালাটা ড্রেসিং টেবিলের এক কোণে ছুড়ে ফেলে দিয়ে
তিনি যখন তাঁর বিশাল শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরের বাতিটা নিভিয়ে দেন—
ঠিক তখনই সেই অন্ধকার ড্রয়িংরুমে নেমে আসে ‘প্রথম নিরবতা’।
সেই নিরবতা কোনো করতালি দেয় না।
সে কোনো তোষামোদের ফুল নিয়ে তাঁর সামনে দাঁড়ায় না।
সে কেবল এক হিমশীতল বাতাসের মতো তাঁর চারপাশে ঘুরে এসে
তাঁর কানের কাছে চুপিচুপি জিজ্ঞেস করে—
‘পুরো শহর তো তোমাকে সম্মান দিল;
কিন্তু তুমি কি কোনোদিন একা এই ঘরের আয়নায়
নিজের চোখের দিকে তিন সেকেন্ডের বেশি তাকিয়ে থাকতে পেরেছ?’
তখন সেই সম্মানিত মানুষটি অন্ধকারের ভেতর কুঁকড়ে বসে থাকেন।
তিনি বুঝতে পারেন—
এই পৃথিবীটাকে তিনি নিখুঁতভাবে প্রতারিত করতে পেরেছেন ঠিকই,
কিন্তু নিজের ভেতরে তিনি রেখে গেছেন
এক চরম কাপুরুষ, শূন্য এবং অভিশপ্ত
অসমাপ্ত বাক্যের কঙ্কাল।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।