কাঠের পুরোনো কাঠগড়াটা বড় প্রাচীন।
এর শক্ত রেলিংয়ের ওপর হাত রাখলে আজও স্পষ্ট টের পাওয়া যায়—
বিগত পঞ্চাশ বছরে কত হাজার ক্ষুধার্ত আর নির্দোষ মানুষের
আঙুলের ঘাম ও কাঁপুনির দাগ এখানে জমাট বেঁধে আছে।
আজকের এই বিচারসভায় জাঁকজমকের কোনো অভাব নেই।
উঁচু বেদিতে বসে আছেন বিজ্ঞ বিচারকমণ্ডলী;
তাঁদের পরনে ধুলোহীন কালো কোট, চোখে ধারালো ফ্রেমের চশমা,
আর সামনের চওড়া সেগুন কাঠের টেবিলে সাজানো আছে
চামড়ায় বাঁধানো আইনের ভারী ভারী সংকলন।
অভিযোগটি অত্যন্ত গুরুতর এবং সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত—
কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এই ছেঁড়া স্যান্ডেল পরা মানুষটি
এক মাঝরাতে শহরের প্রধান খাদ্যগুদামের তালা ভাঙার চেষ্টা করেছিল।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অত্যন্ত তেজস্বী গলায় আইনের ধারা ব্যাখ্যা করছেন।
তিনি সংবিধানের অনুচ্ছেদ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন,
শৃঙ্খলার গুরুত্ব নিয়ে পাণ্ডিত্যপূর্ণ ভাষণ দিচ্ছেন,
আর হাত নেড়ে প্রমাণ করছেন—কীভাবে এই একক ব্যক্তিটি
গোটা সমাজের শান্তি আর নিরাপত্তার ভিত্তিমূলে কুঠারাঘাত করেছে।
হলভর্তি ভদ্রলোকেরা গম্ভীর মুখে সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ছেন।
সাংবাদিকরা নিবিষ্ট মনে লিখে নিচ্ছেন দণ্ডবিধির কঠিন সংখ্যাগুলো।
সব বক্তব্য শেষে বিচারক যখন চশমার কাচ মুছে গম্ভীর গলায় জানতে চাইলেন—
‘আসামি, তোমার আত্মপক্ষ সমর্থনে কি কিছু বলার আছে?’
তখন কাঠগড়ার মানুষটি কোনো আইনজীবীর দিকে তাকাল না।
সে কোনো ক্ষমা চাইল না,
হাতজোড় করে কোনো করুণার আবেদন জানাল না।
সে শুধু একবার শান্ত, শুকনো চোখে তাকাল সেই উঁচু মঞ্চটির দিকে—
যেখানে বসে আছেন সেইসব সম্মানিত নাগরিকেরা,
যাঁদের এক সইয়ে বাজারে চালের দাম রাতারাতি বেড়ে যায়,
যাঁদের সিন্ডিকেটের গুদামে হাজার টন খাদ্য পচে নষ্ট হয়,
অথচ বাইরে এক মুঠো ভাতের জন্য শিশুরা ডাস্টবিনে হাত বাড়ায়।
সে কোনো কথা বলল না।
সে শুধু নিজের রুগ্ণ, অভুক্ত দুটো হাত উঁচু করে কাঠগড়ার রেলিংয়ের ওপর রাখল—
যেন তার ফাঁকা অঞ্জলিই এই পৃথিবীর যাবতীয় আইনের চেয়ে বড় দলিল।
আর ঠিক তখনই,
আইনের সমস্ত অহংকারী ধারাকে চূর্ণ করে দিয়ে
সেই গমগমে এজলাসে নেমে এলো ‘প্রথম নিরবতা’।
সেই নিরবতা কোনো আত্মসমর্পণ ছিল না;
ওটা ছিল এই সাজানো সার্কাসের মুখের ওপর ছুঁড়ে দেওয়া এক চরম চপেটাঘাত।
বিচারকের হাতের কাঠের হাতুড়িটা আঘাত করার আগেই বাতাসে থমকে গেল।
উকিলের মুখের যুক্তিগুলো হঠাৎ তোতলামিতে রূপ নিল।
কারণ সেই নিঃশব্দ কাঠগড়াটি গোটা আদালতকে জানিয়ে দিয়ে গেল—
এখানে কোনো চোরের বিচার হচ্ছে না;
এখানে বিচার হচ্ছে এক ভুখা মানুষের টিকে থাকার স্পর্ধার।
আর রায় ঘোষণার আগেই পুরো বিচারসভা এক ভয়ংকর সত্যের সামনে এসে দাঁড়াল—
যেখানে উঁচু বেদিতে বসে থাকা বিচারকরাই আসলে আজীবনের দণ্ডিত আসামি,
আর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই নীরব মানুষটি—
তাদের সমস্ত সভ্যতার ভণ্ডামিকে চিরতরে অস্বীকার করে যাওয়া
এক অবিনশ্বর, অসমাপ্ত বাক্য।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।