শীতাতপনিয়ন্ত্রিত মিলনায়তনের নরম লাল গদির চেয়ারে বসে
হাজারটা হাত যখন একসঙ্গে একে অপরের ওপর আছড়ে পড়ে,
তখন দূর থেকে মনে হয়—এই বুঝি কোনো পরম সত্যের জন্ম হলো!
শব্দটা চারপাশের কংক্রিটের দেওয়াল কাঁপিয়ে তোলে,
মাইক্রোফোনের স্পিকারে প্রতিধ্বনিত হয়,
আর মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার মুখে ফুটিয়ে তোলে
এক নিপুণ, সুবিন্যস্ত আত্মতৃপ্তির হাসি।
কিন্তু এই করতালি আসলে কীসের শব্দ?
এটা কি কোনো নতুন আবিষ্কারের আনন্দ?
নাকি হাজারটা মানুষের একসঙ্গে মাথা নত করার এক অলিখিত সনদপত্র?
ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে করতালি দেওয়া এই পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ কাজ।
এতে কোনো ঝুঁকি নেই, কোনো আইনি জটিলতা নেই,
নিজের নাম প্রকাশ করার কোনো দায় নেই।
করতালি দিলে প্রমাণ করতে হয় না তুমি বক্তার কথা বিশ্বাস করেছ কি না;
শুধু সবার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দুটো হাতের তালু পিটিয়ে দিলেই হলো—
মুহূর্তেই তুমি একজন বাধ্য, সভ্য এবং অনুগত নাগরিক হয়ে উঠবে।
মঞ্চের বক্তা যখন চড়া গলায় একটা নির্জলা মিথ্যা ঘোষণা করেন,
যখন তিনি অনাহারক্লিষ্ট মানুষের মানচিত্রে বসে শোনান এক রূপকথার গল্প—
তখনও করতালি থামে না।
বরং হাততালির শব্দটা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
যেন মানুষ করতালি দিচ্ছে বক্তাকে সমর্থন জানাতে নয়;
মানুষ হাততালি দিচ্ছে যাতে তাদের নিজেদের বুকের ভেতরের বিবেক
কোনো অস্বস্তিকর প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তাদের বিব্রত করতে না পারে।
করতালি হলো এই সভ্যতার এক ভয়ংকর মাদক।
সে এত বেশি শব্দ তৈরি করে—
যাতে মেঝের ওপর খসে পড়া কোনো নিপীড়িত মানুষের গোঙানির আওয়াজও
কারও কানে পৌঁছাতে না পারে।
কিন্তু এই কোলাহল চিরস্থায়ী হয় না।
সভা শেষ হয়, সাইরেন বাজিয়ে কনভয় চলে যায়,
হলরুমের উজ্জ্বল আলোগুলো একে একে নিভিয়ে দেওয়া হয়।
যখন মেঝের ওপর পড়ে থাকে কেবল ফেলে দেওয়া পানির বোতল আর ছেঁড়া লিফলেট,
আর দরজার কোণে ঝাড়ু হাতে এসে দাঁড়ায় এক নিঃশব্দ পরিচ্ছন্নতাকর্মী—
ঠিক তখনই সেই শূন্য মিলনায়তনে নেমে আসে ‘প্রথম নিরবতা’।
সেই নিরবতার কোনো হাত নেই, কোনো করতালি নেই।
সে কেবল শূন্য ডায়াসটার দিকে তাকিয়ে এক অমোঘ রায় দিয়ে যায়—
যে হাতগুলো এতক্ষণ করতালি দিয়ে রক্তিম হয়ে উঠেছিল,
তারা কোনো মহৎ মানুষকে অভিবাদন জানায়নি;
তারা আসলে নিজের অজান্তেই হাততালি বাজিয়ে
নিজেদেরই মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়ার দৃশ্য উদযাপন করে বাড়ি ফিরে গেছে—
আর ফেলে রেখে গেছে
সমগ্র জাতির এক দীর্ঘ, অসমাপ্ত আর্তনাদ।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।