সমাজ

আমি বহুবার খুঁজে দেখেছি—সমাজ থাকে কোথায়?
কোন ফ্ল্যাটে তার বাসা?
জাতীয় পরিচয়পত্রে তার নাম কী লেখা আছে?

তার কোনো সুনির্দিষ্ট শরীর নেই, কোনো রক্তমাংসের মুখ নেই।
অথচ এই শহরের প্রতিটি গলির মোড়ে,
চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে,
কিংবা জানালার ভারী পর্দার সামান্য ফাঁকে
তার হাজার হাজার সতর্ক চোখ অনবরত পাহারা বসিয়ে রেখেছে।

যখন ঘরের কোণে চালের ড্রামটা শূন্য হয়ে যায়,
যখন প্রেসক্রিপশনের দাম মেটাতে না পেরে এক যুবক মধ্যরাতে একা গলি দিয়ে হেঁটে যায়—
তখন এই সমাজের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।
তখন তার কোনো কান নেই, কোনো তহবিল নেই,
কোনো ব্যথিত দীর্ঘশ্বাস ফেলার মতো সময় নেই।

কিন্তু সেই অভাবী মানুষটা যদি বাঁচার তাড়নায় কোনো একটা ভুল করে বসে,
কিংবা কোনো অপমানিত নারী যদি নিজের খাঁচা ভেঙে এক পা বাইরে বাড়ায়—
তখন এই সমাজ মুহূর্তের মধ্যে জেগে ওঠে।
অজস্র নীতিবান বিচারক তখন পকেট থেকে ফতোয়া বের করে,
রাস্তার মোড়ে মোড়ে আদালত বসিয়ে দেয়,
আর পাথর ছুড়ে মারার জন্য সবার হাত একসঙ্গে উঁচিয়ে ওঠে।

সমাজ আসলে কোনোদিন মানুষকে বাঁচাতে আসেনি।
সে এসেছে মানুষের ডানাগুলোকে নিখুঁতভাবে ছেঁটে দেওয়ার জন্য;
যাতে কেউ এই বন্দিশালার চেয়ে উঁচুতে উড়তে না পারে।

সে দুর্বলকে ক্ষমা করে না,
আর সবলকে প্রশ্ন করার সাহস পায় না।
সে কেবল দুর্বলতম মানুষটার টুঁটি চেপে ধরে
নিজের সমস্ত ভণ্ডামি আর পাপকে ধুয়ে ফেলার নাটক করে।

মানুষ যখন এই সমাজের সমস্ত অবিচার সহ্য করতে করতে
একদিন সব আর্তনাদ থামিয়ে দেয়,
যখন সে বিচার চাওয়া বন্ধ করে দেয়,
তখন সেই অন্যায়ের স্তূপের নিচে জন্ম নেয় ‘প্রথম নিরবতা’।

সেই নিরবতার সামনে দাঁড়ালে সমাজের কোনো আইন কাজ করে না।
সেই নিরবতা সমাজকে এক নগ্ন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়—

সমাজ আসলে সভ্য কোনো ব্যবস্থার নাম নয়;
সমাজ হলো একদল ভীতু মানুষের তৈরি করা এমন এক অদৃশ্য গিলোটিন—
যেখানে প্রতিদিন একটি করে স্বাধীন মানুষকে হত্যা করা হয়,
যাতে তারা কোনোদিন বুঝতে না পারে
সমাজ নামক এই বিশাল অট্টালিকাটি দাঁড়িয়ে আছে
কোটি কোটি অসমাপ্ত বাক্যের লাশের ওপর।


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।