মুখোশের দোকান

মুখোশের দোকান

- মোঃ আবু তালেব

শহরের সবচেয়ে জনবহুল মোড়ে
খুব পরিপাটি কাচের শোকেস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই দোকান।
এর কোনো আলাদা সাইনবোর্ডের প্রয়োজন হয় না;
কোনো চটকদার লিফলেট বিলি করতে হয় না।
মানুষ খুব ভোরবেলা নিজের গরজেই এখানে লাইন দেয়।

তাকের ওপর অত্যন্ত যত্নে সাজানো আছে নানা মাপের মুখ—
অফিসের বসের সামনে দাঁড়ানোর জন্য খাঁটি আনুগত্যের মুখ,
ক্যামেরার ঝলকানিতে পরার মতো মানবিক সমাজসেবকের মুখ,
ড্রয়িংরুমে অতিথিদের চা দেওয়ার সময় ঝুলিয়ে রাখার মতো সুখী মানুষের মুখ,
আর পাওনাদারের মুখোমুখি হলে পরার জন্য অসহায় দীনতার মুখ।

এখানে সব ধরনের আয়োজন আছে।
শুধু নিজের আসল মুখটা লুকিয়ে রাখার জন্য
যে মাপের আবরণ দরকার, তা আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেই হলো।

এই দোকানে কোনো কাগুজে নোটের লেনদেন হয় না।
দোকানি খুব শান্ত গলায় দামের হিসাব চায়—
একটুখানি আত্মমর্যাদা, কিছুটা সততা,
আর বুকের ভেতরে লুকিয়ে রাখা শৈশবের সেই নিষ্কলুষ লজ্জা।

মানুষ নির্দ্বিধায় সেই দাম চুকিয়ে দেয়।
তারপর টাই বাঁধার মতো, কিংবা জুতোর ধুলো ঝাড়ার মতো—
মুখোশটা মুখের চামড়ার ওপর নিখুঁতভাবে এঁটে নিয়ে রাস্তায় নামে।

কেউ যদি কোনোদিন ভুলবশত নিজের আসল মুখ নিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়ে,
এই শহর তার দিকে আতঙ্কের চোখে তাকায়।
ট্রাফিকের মানুষ তাকে উন্মাদ ভাবে,
প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘরের কপাট আটকে দেয়;
কারণ সভ্যতার এই বাজারে নগ্ন সত্য মুখের চেয়ে
ভয়ংকর কোনো অপরাধ আর হতে পারে না।

মুখোশ পরে থাকতে থাকতে মানুষের এক অদ্ভুত আরাম হয়।
তাকে আর সত্যি বলে বিপদে পড়তে হয় না,
ক্ষতের রক্তক্ষরণ নিয়ে কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয় না।

কিন্তু আসল বিভীষিকাটা শুরু হয় বহু বছর পর।

একদিন মধ্যরাতে, যখন সব কোলাহল নিভে যায়,
মানুষ যখন নিজের একলা ঘরের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
মুখোশটা খুলে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চায়—
তখন সে শিউরে উঠে আবিষ্কার করে,
মুখোশের আঠা আর কৃত্রিম রং তার রক্ত-মাংসের চামড়ার সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেছে।
টান দিলে মাংস ছিঁড়ে আসে, কিন্তু মুখোশ আর আলগা হয় না।

ঠিক তখনই মানুষের জীবনে নেমে আসে ‘প্রথম নিরবতা’।

আয়নার ওপারে যে অচেনা অবয়বটি দাঁড়িয়ে থাকে,
সে কাঁদতে পারে না; কারণ তার চোখের জল বহু আগেই প্লাস্টিক হয়ে গেছে।
সে নিজের দিকে তাকিয়ে শুধু এক অসীম আতঙ্কে থমকে থাকে—

সে বুঝতে পারে, এই সমাজে বেঁচে থাকার সামান্য সুবিধা কিনতে গিয়ে
সে আসলে নিজের সমস্ত মানবিক অস্তিত্বই খুইয়ে ফেলেছে;
আর আয়নায় এখন যা দাঁড়িয়ে আছে—
তা কোনো মানুষ নয়,
একটি বিক্রি হয়ে যাওয়া মুখোশের ভেতর আটকে থাকা
অনন্তকালের এক বিকলাঙ্গ, অসমাপ্ত বাক্য।


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।