যে প্রেম খুব জোর গলায় নিজের দাবি ঘোষণা করেছিল,
সে তো একদিন সামাজিক স্বীকৃতির খাতায় সই করল;
তারপর সংসারের কিস্তির হিসাবে, বাজারের ব্যাগের ওজনে,
আর ছোটখাটো অভ্যাসের ঘর্ষণে একসময় ক্লান্ত হয়ে ফুরিয়ে গেল।
উচ্চারিত প্রেম শেষ পর্যন্ত এই পৃথিবীর নিয়মের কাছে ধরা দেয়।
সে দরদাম করে, আপস শেখে, আর বয়স বাড়লে বেঁচে থাকে কেবল দায়িত্বের খাতিরে।
কিন্তু সেই প্রেমটার কথা একবার ভাবো—
যে জীবনে কোনোদিন একটা শব্দও খরচ করেনি।
যার কোনো স্বাক্ষরিত চিঠি ছিল না,
মুঠোফোনের কোনো ইনবক্সে যার কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ জমা নেই।
তার কোনো আনুষ্ঠানিক জন্মদিন ছিল না,
কোনো ক্যাফের টেবিলে বসে অধিকার জাহির করার দৃশ্য ছিল না।
সে শুধু বেঁচে ছিল অত্যন্ত সামান্য কিছু ইঙ্গিতে—
ভিড় বাসের দরজায় অন্য কারও ধাক্কা থেকে বাঁচাতে গিয়ে
এক মুহূর্তের জন্য নিজের শরীরটাকে প্রাচীর বানিয়ে নেওয়া;
বৃষ্টির রাতে নিজের কাঁধ ভিজিয়ে দিয়ে
ছাতার সামান্য ছায়াটা অন্যজনের দিকে একটু বাড়িয়ে ধরা;
কিংবা রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে
ট্রাফিকের সবুজ বাতি জ্বলে ওঠার আগের তিন সেকেন্ড
এক অচেনা মানুষের মতো কেবল চোখ তুলে তাকিয়ে নেওয়া।
সে কেন কথা বলেনি?
সে কি ভীরু ছিল?
হয়তো সমাজ তাকে কাপুরুষ বলবে।
কিন্তু যে জানত নিজের পকেটে নড়বড়ে একজোড়া চটি জুতো ছাড়া আর কিছুই নেই,
যে জানত তার ভবিষ্যৎ বলতে অনিশ্চিত এক অন্ধকার পথ—
সে অন্য কারও সাজানো আকাশকে নিজের দারিদ্র্য দিয়ে ঢেকে দিতে চায়নি।
কথা না বলাটা কোনো দুর্বলতা ছিল না;
ওটা ছিল ভালোবাসার চরমতম আত্মমর্যাদা।
সে চেয়েছিল, যা সুন্দর—তা যেন এই নির্মম পৃথিবীর নোংরা দরদামে কোনোদিন না নামে।
সেই প্রেমই মানুষের জীবনে নামিয়ে আনে ‘প্রথম নিরবতা’।
যে নিরবতা কোনোদিন কাউকে অভিযুক্ত করে না,
কোনোদিন কোনো কৈফিয়ত দাবি করে না।
সে কেবল নিজের রক্তক্ষরণটুকু নিজের ভেতরেই গোপন রেখে
দূর থেকে অন্য মানুষের সুখ দেখে নিঃশব্দে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
পৃথিবী শুধু তাদেরই হিসাব রাখে—যারা দখল করতে পেরেছে,
যারা উল্লাস করেছে, উৎসবের আলো জ্বেলেছে।
কিন্তু মানুষ একা হলে নিজের বুকের নিভৃতে হাত দিয়ে যাকে স্পর্শ করে,
সে কোনো দখল করা সাম্রাজ্য নয়।
যে প্রেম কোনোদিন কথা বলেনি, সে আসলে হারায়নি;
সে এই হিসেবি পৃথিবীর সমস্ত কলুষতা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে
চিরদিনের মতো সংরক্ষিত হয়ে রইল—
মানুষের বুকের গভীরতম ক্ষতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা
এক অবিনশ্বর, পবিত্র অসমাপ্ত বাক্য হয়ে।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।