মঞ্চের সমস্ত চড়া আলো যখন নিভে যায়,
দর্শকের করতালির শেষ প্রতিধ্বনিটুকুও যখন বাতাসে মিলিয়ে যায়—
তখন মানুষ গ্রিনরুমে ফিরে আসে একা।
সে একে একে খুলে ফেলে তার পরিচিত রূপগুলো—
অন্যকে বশ করার মুখোশ,
সমাজকে তুষ্ট করার মুখোশ,
ধনী সাজার মুখোশ, কিংবা ক্ষমতাবানের কৃত্রিম দয়ার মুখোশ।
সবগুলো টেবিলের ওপর পরিপাটি করে সাজিয়ে রেখে
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে—এবার বুঝি সে মুক্ত।
এবার বুঝি নিজের আসল চামড়ায় একটু বিশুদ্ধ বাতাস লাগবে।
কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাত বাড়াতেই
সে এক হিমশীতল আতঙ্কে থমকে যায়।
সে দেখে—মুখের ওপর এখনো একটি শেষ আস্তরণ শক্ত হয়ে লেগে আছে।
এই শেষ মুখোশটি কোনো প্লাস্টিক বা রঙের তৈরি নয়।
এটা কেনা হয়নি কোনো বাজারের দোকান থেকে।
এটা তৈরি হয়েছে মানুষের আজন্মের এক গোপন অহংকার দিয়ে—
যার নাম: ‘আমি ভালো আছি।’
এই শেষ মুখোশটি পরেই একজন পিতা
অফিসের সমস্ত লাঞ্ছনা আর ব্যর্থতা গিলে ফেলে
ঘরে ঢুকে সন্তানের সামনে এক অদ্ভুত কৃত্রিম হাসি হাসে।
এই মুখোশটি পরেই একজন নিঃস্ব মানুষ
বন্ধুদের আড্ডায় বসে সবচেয়ে চড়া গলায় কৌতুক শোনায়,
যাতে কেউ তার চোখের গভীরে জমে থাকা অন্ধকারটা মেপে ফেলতে না পারে।
এই মুখোশটি পরেই মানুষ মৃত্যুর আগের রাতেও
বুকের তীব্র ব্যথাটা দাঁতে দাঁত চেপে চেপে রাখে,
যাতে পাশের বিছানায় ঘুমিয়ে থাকা মানুষটির ঘুম ভেঙে না যায়।
অন্য সব মুখোশ মানুষ পরে অন্যকে ঠকানোর জন্য;
কিন্তু এই শেষ মুখোশটি মানুষ পরে কেবল নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।
এটা কোনো প্রতারণা নয়;
এটা হলো এই নির্দয় পৃথিবীর সামনে নিজের করুণ পরাজয়কে ঢেকে রাখার
চরমতম, শেষ মানবিক প্রতিরোধ।
কিন্তু এই আবরণ মানুষকে শান্তি দেয় না।
ভেতরে ভেতরে ক্ষতটা গ্যাংগ্রিনের মতো ছড়াতে থাকে,
আর মানুষ একটু একটু করে নিজেরই নিঃশ্বাসের ভারে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আসে।
তারপর এক নিঃসঙ্গ প্রহরে,
যখন আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট থাকে না,
যখন মিথ্যার শেষ সান্ত্বনাটুকুও বরফের মতো গলে যায়—
তখন খসে পড়ে এই শেষ মুখোশটিও।
ঠিক সেই মুহূর্তে মানুষের জীবনে নেমে আসে ‘প্রথম নিরবতা’।
কোনো আবরণ নেই, কোনো অভিনয় নেই, কোনো অজুহাত নেই।
আয়নার সামনে তখন দাঁড়িয়ে থাকে এক সম্পূর্ণ অনাবৃত, রক্তাক্ত সত্তা—
যে অবশেষে নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে স্বীকার করতে বাধ্য হয়:
সে কোনো বিজয়ী গল্প হতে পারেনি;
সে ছিল সারা জীবন নিজেকে লুকিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টায়
ক্ষয়ে যাওয়া এক অসহায়, অসমাপ্ত বাক্য।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।