সূর্য ডোবার পর যে অন্ধকার নামে,
তার জন্য তো প্রকৃতির একটা নিয়ম বরাদ্দ আছে।
পাখিরা কুলায়ে ফেরে, রাজপথের তীব্র হর্ন স্তিমিত হয়,
আর ঘরের জানালায় একে একে জ্বলে ওঠে হলুদ আলোর বিন্দু।
কিন্তু যে রাতটা আজ আমাদের দুজনের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়েছে—
তার কোনো ক্যালেন্ডার নেই, কোনো ভোরের প্রতিশ্রুতি নেই।
একই ঘরের ভেতর আমরা দুজন।
মাঝখানের দূরত্বটুকু মাপলে হয়তো এক হাতও হবে না।
অথচ এই সামান্য মেঝের ওপর
কে যেন নিঃশব্দে বিছিয়ে দিয়ে গেছে অনন্ত এক মরুভূমি।
তোমার মুখের ওপর কাঁপছে তোমার মুঠোফোনের ঠান্ডা নীল আলো,
আমার মুখের ওপর আমারটা।
আমাদের চোখ দুটো স্ক্রিনের ভেতর দিয়ে
হাজার মাইল দূরের পৃথিবীর খবর নিখুঁতভাবে পড়ে নিচ্ছে;
অথচ মাঝখানের এই এক বিঘত আঁধার পার হওয়ার মতো
কোনো সহজ রাস্তা আমাদের জানা নেই।
আমাদের মধ্যে কোনো বড় ধরনের রক্তপাত ঘটেনি।
কোনো জিনিসপত্র ভাঙচুর হয়নি, কোনো কটু শব্দ বাতাসে ছিটকে পড়েনি।
আমরা দুজনই অত্যন্ত ভদ্র, পরিপাটি এবং সামাজিক।
অথচ এই নিপুণ ভদ্রতার ছায়াতেই
একটু একটু করে জমে উঠেছে এমন এক পাথর—
যা কোনো হাতুড়ি দিয়ে ভাঙা যায় না।
এই রাতটা আসলে কোনো অন্ধকার নয়।
এই রাতটা তৈরি হয়েছে আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট আপস দিয়ে,
সংসার টিকিয়ে রাখার নামে গিলে ফেলা না-বলা ক্ষোভ দিয়ে,
আর সবচেয়ে বড়—সেই তীব্র ভীতি দিয়ে,
যেখানে সত্যি কথাটা একবার উচ্চারণ করলেই
আমাদের এতদিনের সাজানো সুরক্ষার দেওয়ালটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে।
মানুষ যখন কোলাহলের ভেতর একা হয়, তখন সে কষ্ট পায়।
কিন্তু মানুষ যখন সবচেয়ে কাছের মানুষটার পাশে বসেও
নিজের ভেতরের নিঃসঙ্গতাকে ঢাকতে পারে না—
তখন সেখানে জন্ম নেয় ‘প্রথম নিরবতা’।
এই নিরবতার কোনো ভাষা নেই।
সে শুধু বুকের মাঝখানে একটা বরফের টুকরোর মতো চেপে বসে থাকে।
আমরা হয়তো কাল সকালে আবার জেগে উঠব,
নিয়ম মেনে চায়ের কাপ এগিয়ে দেব, ট্রাফিকের হিসাব করব,
বাইরের পৃথিবীর কাছে প্রমাণ করব—আমাদের কোনো কমতি নেই।
কিন্তু আমরা দুজনই ভেতর থেকে জেনে গেছি—
আমাদের মাঝখানে যে রাত নেমে এসেছে, তার আর কোনো সূর্যোদয় হবে না।
আমরা পাশাপাশি শুয়ে থাকব ঠিকই,
কিন্তু আমরা আর কোনো পূর্ণ গল্প হতে পারব না;
আমরা কেবল একই ছাদের নিচে পাশাপাশি পড়ে থাকা
দুটো বিপরীতমুখী, অসমাপ্ত বাক্য।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।