মানচিত্রের জাগ্রত রাত (৭ নভেম্বর)

মানচিত্রের জাগ্রত রাত (৭ নভেম্বর)

- মোঃ আবু তালেব

নভেম্বরের সেই হিম কুয়াশা কেবল শীতের বার্তা নিয়ে আসেনি,
নিয়ে এসেছিল এক রুদ্ধশ্বাস রাতের অন্ধকার।
চারিদিকে বিভ্রান্তি, অন্দরে অন্দরে ক্ষমতার কুৎসিত পাশাখেলা,
আর সীমান্তের ওপারে ওত পেতে থাকা শকুনের অতৃপ্ত দৃষ্টি—
রাষ্ট্র তখন নিজেরই ছায়াকে ভয় পাচ্ছিল।

ক্ষমতা যখন রুদ্ধদ্বার কক্ষে বসে
একটি জাতির ভাগ্যকে পণ্যের মতো দরদাম করছিল,
তখন কোনো রাজকীয় ফরমান জারির অপেক্ষায় বসে থাকেনি রাজপথ।

ব্যারাকের সাধারণ সৈনিক আর ফুটপাতের সাধারণ মানুষ—
ইতিহাস যাদের কেবল আজ্ঞাবহ সংখ্যার মতো ব্যবহার করতে চেয়েছিল,
তারা সেদিন এক অলিখিত ইঙ্গিতে ভেঙে ফেলেছিল সমস্ত দেয়াল।

ট্যাঙ্কের শক্ত, শীতল লোহার ওপর সেদিন কোনো হিংস্রতা ছিল না;
সেখানে ঘটেছিল এক ঐতিহাসিক আলিঙ্গন।
রাইফেল ধরা হাত আর লাঙল চালানো হাত
একে অপরকে ছুঁয়ে বুঝে নিয়েছিল—
মাটি যদি হারিয়ে যায়, তবে কোনো সিংহাসনই আর অবশিষ্ট থাকে না।

বিপ্লব কোনো শূন্য স্লোগানের নাম নয়;
বিপ্লব হলো দাসত্বের চুক্তিপত্রকে এক নিমেষে পদদলিত করার স্পর্ধা।
আর সংহতি কোনো কাগুজে ঐক্যের মহড়া নয়;
সংহতি হলো হাজারো মতপার্থক্য সত্ত্বেও
নিজের সার্বভৌমত্বকে অন্যের পায়ে বন্ধক না দেওয়ার চরম পণ।

সেদিন সিপাহি আর জনতা বুঝিয়ে দিয়েছিল—
এই দেশ কোনো তাঁবেদারির চারণভূমি হতে জন্মায়নি;
এ দেশের মানচিত্র কোনো প্রভুর করুণার দান নয়।

কিন্তু আজ, এত বছর পর—
ইতিহাস যখন কেবল বাৎসরিক সভার বক্তৃতায় বন্দি হতে চায়,
তখন আমাদের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সেই রাত।

আজও কি আমরা সেই সংহতির প্রকৃত অর্থ বুঝতে পেরেছি?
নাকি আধিপত্যের নতুন শৃঙ্খল আর নিজেদের ভেতরের লোভ
আমাদের মেরুদণ্ডকে আবার নুয়ে দিতে চাইছে?

সার্বভৌমত্ব কোনো সমাপ্ত দলিল নয়, যা একবার লিখে নিলেই চলে।
সার্বভৌমত্ব হলো প্রতিটি প্রজন্মের রক্তে বয়ে চলা এক চিরন্তন দায়—
এক অবিনশ্বর, অসমাপ্ত বাক্য;
যার সম্মান বাঁচাতে হলে আজও মানুষকে
নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ভুলে দাঁড়িয়ে পড়তে হয়
একই মাটির পতাকাতলে।


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।