যখন গোটা দেশজুড়ে নেমে এসেছিল নিশ্ছিদ্র অমানিশা,
রাজনীতির মঞ্চ যখন বিভ্রান্ত, চারদিকে এক দিশাহীন হাহাকার—
তখন কালুরঘাটের ভাঙা ট্রান্সমিটারের ভেতর থেকে
বজ্রের মতো আছড়ে পড়েছিল একটি নির্ভীক কণ্ঠস্বর:
‘আমি মেজর জিয়া বলছি...’
সে কেবল কোনো সামরিক ঘোষণা ছিল না;
ওটা ছিল এক অবরুদ্ধ, নিরস্ত্র জাতির বুকে
স্বাধীনতার প্রথম স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দেওয়ার ঐতিহাসিক স্পর্ধা।
তুলে নেওয়া রাইফেলের ট্রিগারে তিনি শুনিয়েছিলেন
মাথা নত না করার আদিম মন্ত্র।
তারপর এলো নভেম্বরের সেই রুদ্ধশ্বাস রাত।
ষড়যন্ত্রের কালো মেঘ যখন আবার গিলতে চেয়েছিল এই মানচিত্রকে,
যখন খাদের কিনারায় কাঁপছিল নবীন সার্বভৌমত্ব—
তখন তিনি আর শুধু ব্যারাকে বন্দি রইলেন না;
সিপাহি আর জনতার উত্তাল তরঙ্গে ভেসে
তিনি হয়ে উঠলেন এই ভূখণ্ডের ভরসার একমাত্র নোঙর।
জিয়া কোনো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ড্রয়িংরুমের শাসক ছিলেন না।
গায়ে সেই পরিচিত ধূসর সাফারি, পায়ে ধুলোমাখা সাধারণ জুতো—
তিনি নেমে গিয়েছিলেন রোদে পোড়া কৃষকের ধানক্ষেতে।
কোদাল হাতে মাটি কেটে, শ্রমিকের পাশে বসে ঘাম মুছে
তিনি এক পরনির্ভরশীল জাতিকে শুনিয়েছিলেন আত্মনির্ভরতার গান।
তিনি শিখিয়েছিলেন—
অন্যের করুণায় মাথা গুঁজে বাঁচার নাম সার্বভৌমত্ব নয়;
সার্বভৌমত্ব হলো নিজের জমিনে বুক টানটান করে দাঁড়ানোর আত্মমর্যাদা।
ক্ষমতা তাঁকে অনেক কিছু দিতে পারত;
কিন্তু তিনি ক্ষমতার কাছ থেকে কেবল দায়িত্বটাই তুলে নিয়েছিলেন,
কোনো বৈভব স্পর্শ করতে পারেননি তাঁকে।
তাই ঝড়ের মতো এক বিষাদময় ভোরে যখন বুলেট তাঁর বুক চিরে চলে গেল,
তখন তাঁর রেখে যাওয়া ধনসম্পদ খুঁজতে গিয়ে
গোটা বিশ্ব স্তব্ধ হয়ে দেখল—
একটি ভাঙা স্যুটকেস আর একখানা বিবর্ণ ছেঁড়া গেঞ্জি!
একজন রাষ্ট্রনায়কের এই নিঃস্বতাই
তাঁকে তুলে দিয়ে গেল ইতিহাসের সর্বোচ্চ বেদিতে।
বুলেট দিয়ে শরীর ঝাঁঝরা করা যায়,
কিন্তু যে মানুষটা একটি জাতির মেরুদণ্ডে আত্মসম্মানের রক্ত সঞ্চার করে দিয়ে যায়—
তাকে কোনোদিন কবরের অন্ধকারের নিচে চাপা দেওয়া যায় না।
শহীদ জিয়া কেবল অতীতের কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নন;
তিনি এই মাটির বুকে খোদাই হয়ে থাকা এক অবিনশ্বর সাহস—
একটি জাতির আত্মমর্যাদার সেই অমর, অসমাপ্ত বাক্য;
যার প্রতিটি শব্দে আজও স্পন্দিত হয়
এই মানচিত্রের মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার অঙ্গীকার।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।