অপেক্ষার সময়গুলো

অপেক্ষার সময়গুলো

- মোঃ আবু তালেব

দেওয়ালের চুন খসে পড়ছে বেশ কিছুদিন ধরে।
কোণের দেওয়ালঘড়িটার ব্যাটারি ফুরিয়ে গেছে বহু আগে,
তার কাঁটাটা আজও নিথর হয়ে আটকে আছে ঠিক বিকেল চারটে কুড়িতে।
এই ঘরে সময়ের কোনো প্রবাহ নেই;
এখানে সময় বরফের মতো জমে থাকে মেঝেতে।

বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, এটা একটা অতি সাধারণ ঘর—
একটি কাঠের চৌকি, ধুলো জমা একখানা পুরোনো টেবিল,
আর জানালার গ্রিলে ঝুলিয়ে রাখা এক চিলতে বিবর্ণ পর্দা।
কিন্তু যে মানুষটা এই মেঝের ওপর খালি পায়ে হেঁটে বেড়ায়,
সে জানে—এই চার দেওয়াল কোনো বাসস্থান নয়;
এটা আসলে এক অদৃশ্য কারাগার, যার কোনো পাহারা নেই।

অপেক্ষা কোনো সহজ কাজ নয়।
অপেক্ষা হলো নিজের বেঁচে থাকার আয়ু দিয়ে
অন্য কারও অনুপস্থিতিকে আজীবন পাহারা দেওয়া।

দরজাটা খোলাই থাকে সারাদিন।
সিঁড়িতে সামান্য কোনো খসখস আওয়াজ হলেই
বুকের ভেতরটা হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়;
কান খাড়া হয়ে ওঠে—কেউ কি এলো?
নাকি ওটা কেবল অন্য কোনো ভাড়াটিয়ার ক্লান্ত পায়ের শব্দ,
কিংবা বাতাসে নড়ে ওঠা কোনো পুরনো কপাটের দীর্ঘশ্বাস?

বাইরে পৃথিবী কত দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
রাস্তায় নতুন নতুন ফ্লাইওভার হচ্ছে, শহরের নাম বদলে যাচ্ছে,
মানুষ কত সহজে পুরনো মুখ মুছে ফেলে নতুন ঠিকানা খুঁজে নিচ্ছে।
অথচ এই ঘরের মানুষটা কোনোদিন নিজের অবস্থান বদলাতে পারল না।
সে শুধু দাঁড়িয়ে রইল জানালার ওপারে চোখ রেখে—
যেন এই শহর থেকে সমস্ত কোলাহল মুছে গেলে
একমাত্র এই জানালার কাচেই ভেসে উঠবে কোনো এক চেনা মুখ।

অপেক্ষা করতে করতে মানুষ আসলে কী হারায়?
সে শুধু যৌবন হারায় না, সে শুধু দৃষ্টির ধার হারায় না;
সে ধীরে ধীরে নিজের নামটাও ভুলে যেতে থাকে।
কারণ যে ঘরে কোনো দ্বিতীয় মানুষের প্রবেশ নেই,
সে ঘরে কাউকে নাম ধরে ডাকার কোনো প্রয়োজন অবশিষ্ট থাকে না।

তারপর এক গভীর রাতে,
যখন সমস্ত বিভ্রান্তি কেটে যায়,
তখন এই ঘরের প্রতিটি কোণ জুড়ে নেমে আসে এক গাঢ়, আদিম নিস্তব্ধতা—
প্রথম নিরবতা।

সেই নিরবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ অবশেষে আবিষ্কার করে—
কেউ কোনোদিন আসবে না।
যে চলে গেছে, সে কোনোদিন পেছন ফিরে তাকানোর জন্য জন্মায়নি।

তবু মানুষ এই ঘর ছেড়ে কোনোদিন বের হতে পারে না।
কারণ সে তখন আর মানুষ থাকে না;
সে পরিণত হয় মাঝপথে থেমে যাওয়া এক অসমাপ্ত বাক্যে—
যা অনন্তকাল ধরে একাই পাহারা দিয়ে যায়
তার নিজেরই নিঃশব্দ সমাধি।


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।