আয়নাবিহীন শহর

আয়নাবিহীন শহর

- মোঃ আবু তালেব

এই শহরে কোনো খাঁটি আয়না রাখা নিষিদ্ধ।
নাপিতের দোকানের দেওয়াল থেকে শুরু করে
বহুতল ভবনের লিফট কিংবা বাথরুমের বেসিন—
কোথাও কোনো পারদমাখা পরিষ্কার কাচ খুঁজে পাওয়া যাবে না।
নগর কর্তৃপক্ষ খুব সতর্কভাবে আইন করে দিয়েছেন:
নাগরিকরা কেবল সামনের দিকে তাকাবে,
নিজের মুখোমুখি হওয়া এই শহরের সংবিধানে এক ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।

তবে এই শহরে আলোর কোনো কমতি রাখা হয়নি।
রাস্তার মোড়ে মোড়ে বসানো আছে বিশালাকার ডিজিটাল ডিসপ্লে,
মুঠোফোনের ক্যামেরায় যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে হাজারটা কৃত্রিম ফিল্টার—
যা রাতের ঘুমহীন চোখের কালি নিমেষে মুছে দেয়,
চামড়ার বয়সের ভাঁজ নিখুঁতভাবে টানটান করে তোলে,
আর গলার কাছের ক্ষতের দাগগুলোকে ঢেকে দিয়ে
ফুটিয়ে তোলে এক মোহময়, সাজানো সৌন্দর্য।

মানুষ সেই ফিল্টারের পর্দার দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসে;
তারা নিজেদের দিকে তাকিয়ে বলে—‘আমরা কত সভ্য, কত সুন্দর!’

আয়না না থাকার কারণে এই শহরের কারও মনে কোনো লজ্জা জন্মায় না।
যে কর্মকর্তা টেবিলের নিচ দিয়ে লাখ টাকার ফাইল ছাড়ল,
সে সন্ধ্যায় টিভি ক্যামেরার সামনে এসে সততার দীর্ঘ ভাষণ দেয়;
কারণ নিজের চোখের ভেতরের চোরটাকে দেখার মতো কোনো কাচ তার সামনে নেই।
যে বিচারক ন্যায়ের দাঁড়িপাল্লা ক্ষমতার চরণে বন্ধক রেখে এলেন,
তিনি রাতে বাড়ি ফিরে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েন;
কারণ তাঁর কপালে যে দাসত্বের কালো দাগ বসে গেছে,
তা ধরিয়ে দেওয়ার মতো কোনো সত্য এই শহরে অবশিষ্ট রাখা হয়নি।

এখানে সবাই নির্দোষ, সবাই সাধু, সবাই বিজয়ী।
কারণ দেখার কোনো মাধ্যম না থাকলে
নিজের কুশ্রীতাও এক পরম অহংকারে পরিণত হয়।

কিন্তু প্রকৃতি তো কোনো সেন্সর বোর্ডের নিয়ম মেনে চলে না।

একদিন শ্রাবণের প্রবল বর্ষণের পর,
যখন ট্রাফিকের কোলাহল একটু স্তিমিত হয়ে আসে—
ফুটপাতের ভাঙা ইটের ফাঁকে জমে থাকা এক চিলতে বৃষ্টির ঘোলা জলের দিকে
অসতর্কভাবে চোখ পড়ে যায় এক পথচারীর।

সে হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়।
পানির সেই কাঁপতে থাকা স্তরে ভেসে ওঠে এক অচেনা, বীভৎস মুখ—
চোখের কোণে জমাকৃত কাপুরুষতা,
ঠোঁটের চারপাশে পচে ওঠা মিথ্যার আস্তরণ,
আর কপালজুড়ে আজন্মের এক গভীর মেরুদণ্ডহীনতার ছাপ।

সে শিউরে উঠে দুহাতে চোখ ঢেকে ফেলে।
আর ঠিক তখনই সেই নিস্তব্ধ গলির নর্দমার পাশে
কোটি কোটি মিথ্যার রাজপ্রাসাদ কাঁপিয়ে নেমে আসে ‘প্রথম নিরবতা’।

সেই নিরবতা কোনো ক্ষমা ঘোষণা করে না।
সে কেবল সেই জমে থাকা পানির ওপরে দাঁড়িয়ে এক অমোঘ রায় দিয়ে যায়—

আয়না ভেঙে ফেলে তোমরা হয়তো সত্যকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিলে;
কিন্তু নিজেদের পাপ থেকে মুক্তি পাওনি।
তোমরা কেবল পরিণত হয়েছ এক অন্ধ প্রেতাত্মার নগরীতে—
যেখানে কোটি কোটি মানুষ নিজেদের সম্পূর্ণ ভেবে হাততালি দিচ্ছে,
অথচ প্রত্যেকেই আসলে নিজের আসল মুখ হারিয়ে ফেলা
এক একটি বিকৃত, অসমাপ্ত বাক্য।


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।