কংক্রিটের হৃদয়গুলি

কংক্রিটের হৃদয়গুলি

- মোঃ আবু তালেব

শহরটা যখন বড় হচ্ছিল,
তখন কেবল মাটি খুঁড়ে সিমেন্ট আর রড ঢালা হয়নি—
মানুষগুলোও নিজেদের ভেতর একটু একটু করে পাথর জমিয়ে নিচ্ছিল।
তা না হলে এই নির্মম রাস্তায় বেঁচে থাকা যেত না।

ফুটপাতে একজন মানুষ জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকলে
যে জুতোজোড়া পাশ কাটিয়ে চলে যায় নিখুঁত গতিতে,
তার মালিক কোনো জল্লাদ নয়।
সে একজন সাধারণ চাকরিজীবী—
ঘরে তার অসুস্থ সন্তান, ব্যাংকে কিস্তির তাড়া, বসের কড়া নজর।
সে থামতে পারে না;
কারণ এই শহরের ব্যাকরণে সহানুভূতি মানেই পিছিয়ে পড়া।

আমরা ফ্ল্যাটের দেয়ালে সাউন্ডপ্রুফ কাচ লাগাই,
যাতে পাশের বাড়ির কান্নার আওয়াজ আমাদের ঘুমে ব্যাঘাত না ঘটায়।
লিফটে ওঠার সময় অন্য আর একজনের চোখের দিকে তাকাই না—
পাছে তার দৃষ্টিতে কোনো ব্যক্তিগত হাহাকার ধরা পড়ে যায়!
মানুষের চোখ এখন আর মনের জানালা নয়;
সে কেবল বন্ধ দরজার ওপর লাগানো ছোট একটি আই-হোল।

সবাই বলে মানুষের হৃদয় পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে।
কিন্তু পাথর তো আঘাত পেলে অন্তত প্রতিধ্বনি তোলে,
কংক্রিট তো কেবল ভার বইতে জানে।
আমরা ভালোবাসা প্রকাশ করতেও এখন চুক্তিপত্র খুঁজি,
কান্না চেপে রেখে হাসিকে বানাই প্রোফাইল পিকচার।

এই বহুতল ভবনের জঙ্গলটাকে দূর থেকে কত আধুনিক দেখায়!
ঝলমলে কাচ, মসৃণ মেঝে, নিখুঁত জ্যামিতিক নকশা।
অথচ সেই দেয়ালগুলোর গায়ে কান পাতলে বোঝা যায়—
পাথরের তৈরি এই খাঁচাগুলো একা নয়,
তার ভেতরে প্রতিটি বুকে
একটি করে শুকিয়ে যাওয়া নদী
কেবল এক ফোঁটা জীবন্ত আর্দ্রতার জন্য
নিঃশব্দে ফেটে চৌচির হয়ে আছে।


শেয়ার করুন:

মন্তব্য করুন

মন্তব্য করতে হলে লগইন করুন।


মন্তব্যসমূহ (0)

এখনো কোনো মন্তব্য নেই।