মানুষ ভাবে—চুপ থাকলে কোনো খরচ নেই।
চুপ থাকলে চাকরিটা নিরাপদ থাকে,
মাঝরাতের পুলিশি তালিকার লাল দাগ থেকে নিজের নামটা মুছে ফেলা যায়,
আর প্রতি মাসের নির্দিষ্ট তারিখে বেতনটা ঠিকঠাক ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হয়।
লোকজন একে প্রজ্ঞা বলে, কেউ কেউ বলে সংসার বাঁচানোর কৌশল।
মনে হয়, এই শহরে চুপ করে থাকার চেয়ে সস্তা আর কোনো আত্মরক্ষা নেই।
তাই রাস্তায় যখন প্রকাশ্য দিবালোকে কোনো তরুণকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হয়,
তুমি খুব সতর্ক হাতে কানে হেডফোনটা গুঁজে দিয়ে হাঁটার গতি বাড়িয়ে দাও।
চায়ের দোকানে যখন ক্ষমতার জুলুম নিয়ে কথা ওঠে,
তুমি বিজ্ঞের মতো চায়ে চুমুক দিয়ে বলো—‘এসব নিয়ে ভেবে কী লাভ? নিজেরটা দেখো।’
তুমি প্রতিদিন সকালের সংবাদপত্রের প্রথম পাতাটা সন্তর্পণে উল্টে দিয়ে
বিনোদন কিংবা খেলার পাতার ছবিতে চোখ আটকে রাখো;
যেন পাতা উল্টালেই এই দেশের সমস্ত ক্ষত মুছে ফেলা যায়।
তুমি ভাবছ, তুমি বেঁচে গেলে।
তুমি ভাবছ, ক্ষমতার চাবুক শুধু তাদের পিঠেই পড়ে—যারা চিৎকার করতে জানে।
কিন্তু তুমি কি সত্যিই হিসাব করে দেখেছ—এই চুপ থাকার দাম কত?
ইতিহাসের খাতা কোনোদিন কাউকে বিনা মূল্যে রেহাই দেয় না।
তুমি প্রতিদিন এক বেলার নিরাপদ ভাতের বিনিময়ে
নিজের বিবেকের এক টুকরো মাংস কেটে তুলে দিচ্ছ ক্ষমতার থালায়।
তুমি সন্তানদের জন্য যে শান্ত পৃথিবী রেখে যাচ্ছ বলে ভাবছ,
আসলে তাদের চারপাশে তৈরি করছ এক নিশ্ছিদ্র দাসত্বের খাঁচা।
এই নিরবতা কোনো ঢাল নয়;
এটা হলো এক ভয়ংকর চক্রবৃদ্ধি ঋণ—
যার আসল তোমাকে একদিন কড়ায়-গণ্ডায় পরিশোধ করতে হবে।
একদিন সেই আগুনের লেলিহান শিখা তোমার নিজের দরজাতেও এসে লাগবে।
যে বুলডোজার দেখে তুমি চোখ বন্ধ করে রেখেছিলে,
সে এসে দাঁড়াবে তোমার নিজেরই স্বপ্নের বারান্দার সামনে।
সেদিন তুমি আর্তনাদ করে রাস্তায় নামবে,
হাতজোড় করে চারপাশের মানুষের দিকে তাকিয়ে বলবে—‘আমাকে বাঁচাও!’
কিন্তু অবাক হয়ে দেখবে—
চারপাশের প্রতিটি বাড়ির জানালার পর্দা শক্ত করে টানা,
সবগুলো দরজায় নিস্তব্ধ খিল আঁটা।
কেউ তোমার দিকে তাকাবে না;
কারণ তুমি যাদের আজীবন চুপ থাকার পাঠ শিখিয়েছিলে,
তারা আজ তোমার ধ্বংসের দিনেও অত্যন্ত বিশ্বস্ত ছাত্রের মতো চুপ করে থাকবে।
ঠিক তখনই তোমার সমস্ত চিৎকার গলার ভেতর আটকে গিয়ে
নামিয়ে আনবে এক নিঃসীম অন্ধকার—
প্রথম নিরবতা।
সেই নিরবতা তোমাকে এক নির্মম আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেবে।
তুমি বুঝতে পারবে—
চুপ থেকে তুমি কোনো বিপদ এড়াতে পারোনি;
তুমি কেবল নিজের মুখে নিজে আঠা এঁটে দিয়ে
স্বেচ্ছায় রূপান্তরিত হয়েছিলে
ইতিহাসের সবচেয়ে কাপুরুষ, মেরুদণ্ডহীন
এক আত্মঘাতী, অসমাপ্ত বাক্যে।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।