ডাক্তাররা খুব সহজে মৃত্যুর একটা সময় লিখে দেন—
রাত দুটো বেজে পনেরো মিনিট,
কিংবা সকাল আটটা।
তাঁরা স্টেথোস্কোপ চেপে নাড়ির গতি মাপেন,
চোখের মণি পরীক্ষা করেন,
তারপর সাদা চাদর টেনে দিয়ে বলেন—‘সব শেষ।’
ডাক্তাররা আসলে খুব স্থূল হিসাব রাখেন।
তাঁরা শুধু শরীরের থেমে যাওয়াটা দেখতে পান;
কিন্তু মানুষ যে তার বহু আগেই ভেতরে ভেতরে কয়েকবার মরে যায়—
সেই মৃত্যুর কোনো ডেথ সার্টিফিকেট তৈরি হয় না।
মানুষ প্রথমবার মরে,
যখন সে নিজের প্রথম সত্যটাকে গিলে ফেলে
একজোড়া ক্ষয়ে যাওয়া জুতো পরে অন্যের হুকুম তামিল করতে বের হয়।
মানুষ আরেকবার মরে,
যখন চোখের সামনে স্পষ্ট অন্যায় হতে দেখেও
সংসার বাঁচানোর ভয়ে সে নিজের জিভ কামড়ে ধরে রাখে;
আর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে সন্তানের নিষ্পাপ চোখের দিকে তাকাতে পারে না।
মানুষ মরে সেই দিনও,
যেদিন ওষুধের দোকানের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে
প্রেসক্রিপশনের দামের সঙ্গে তাকে নিজের বেঁচে থাকার আয়ুর তুলনা করতে হয়।
মানুষ মরে যখন সে বুঝতে পারে—
যাঁর পাশে সে ঘুমিয়ে আছে বিশ বছর ধরে,
তাঁর সঙ্গে তার আর কোনো কথা নেই;
দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি অদৃশ্য দেয়াল,
যার কোনো দরজা নেই, কিন্তু ভাঙার মতো কোনো সাহসও আর অবশিষ্ট নেই।
আমরা প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে আয়নায় যাকে দেখি,
সে কি সত্যিই আমরা?
নাকি সে কেবল এক পুরোনো অভ্যাসের নাম—
যে ট্রাফিকের ভিড় ঠেলে অফিসে যায়,
হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে নিজের বেঁচে থাকার প্রমাণ দেয়,
আর মাস শেষে বাড়ি ফিরে নিঃশব্দে এক কাপ ঠান্ডা চায়ে চুমুক দেয়?
আসলে, যে মৃত্যুর পর আত্মীয়রা কাঁদে, খাটিয়া আসে, কবর খোঁড়া হয়—
সে তো কেবল একটা আনুষ্ঠানিকতা।
সবচেয়ে বড় ভয় তো শরীর মাটিতে মিশে যাওয়া নয়;
সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—
আমরা প্রতিদিন নিজেদের এক-একটি ইচ্ছাকে নিঃশব্দে দাফন করে বাড়ি ফিরি,
অথচ বাইরে থেকে দেখে মনে হয়, মানুষটা দিব্যি বেঁচে আছে।
সবশেষে যখন হৃৎস্পন্দনটা সত্যি সত্যি থেমে যায়,
তখন আসলে নতুন কোনো ঘটনা ঘটে না;
বহু আগেই মাঝপথে থেমে যাওয়া একটা অসমাপ্ত বাক্যের শেষে
সমাজ কেবল দায়সারা এক ফোঁটা পূর্ণচ্ছেদ বসিয়ে দেয়।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।