সকালে যখন মানুষটা সাদা জামাটা গায়ে জড়ায়,
তখন তাকে বড় পরিপাটি, বড় নিষ্পাপ দেখায়।
কয়লার ইস্ত্রির ধারালো ভাঁজ,
কলার আর বোতামের খাঁজে সামান্য নীল সাবানের সুবাস—
দূর থেকে দেখলে মনে হয়,
এই দুর্নীতিগ্রস্ত শহরে এখনো সততা বলে কোনো শুভ্র বস্তু টিকে আছে।
সে খুব সতর্ক পায়ে রাস্তায় নামে।
বৃষ্টির পর জমে থাকা কাদাজল এড়িয়ে সে পা ফেলে মেপে মেপে;
লোকাল বাসে উঠলে লোহার রড ধরতে সে দ্বিধাবোধ করে—
পাছে অন্য কারও ঘাম বা পোড়া মোবিলের দাগ লেগে যায়!
সে ভিড় থেকে নিজেকে সন্তর্পণে আলাদা করে রাখে;
যেন এই সাধারণ সুতির সাদা জামাটা শুধু এক টুকরো কাপড় নয়—
এটা তার মধ্যবিত্ত আত্মমর্যাদার শেষ রক্ষাকবচ।
কিন্তু এই নগরী কোনো শুভ্রতার প্রদর্শনী দেখতে বসেনি।
এখানে দ্রুতগতিতে ছুটে যাওয়া কোনো এক কালো কাচের দামি গাড়ি
ফুটপাতের মানুষের দিকে তাকানোর প্রয়োজনও বোধ করে না।
চাকার নিচ থেকে এক ঝলক নোংরা কাদাপানি ছিটকে এসে
ঠিক তার বুকপকেটের ওপর এক হিংস্র থাবা বসিয়ে দেয়।
মুহূর্তের মধ্যে ধবধবে সাদা জমিনের ওপর
ভেসে ওঠে এক কদর্য, কালো দাগ।
মানুষটা থমকে দাঁড়ায়।
সে চিৎকার করে না, কোনো পাথর তুলে গাড়ির পেছনে ছুড়ে মারে না।
সে কেবল হতভম্ব হয়ে নিজের বুকের দিকে চেয়ে থাকে।
আর ঠিক তখনই তার মনে পড়ে যায়—
এই শহরে যারা বড় বড় শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে কোটি টাকার ভাগবাটোয়ারা করে,
যাদের এক সইয়ে হাজার হাজার মানুষের ভাগ্য বিক্রি হয়ে যায়—
তাদের জামাগুলোও কিন্তু অবিশ্বাস্য রকম সাদা!
তাদের জামায় কোনোদিন রাস্তার কাদা লাগে না,
কারণ তারা নিজেরা নিরাপদে থেকে
পুরো শহরের মানুষের গায়ে কাদা ছিটিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করে রেখেছে।
বাইরের কাদার চেয়েও ভয়ংকর হলো ভেতরের সেই আপস—
যা এই সমাজে টিকে থাকার জন্য মানুষকে প্রতিদিন করতে হয়।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে মানুষটা যখন বালতির পানিতে জামাটা ভিজিয়ে দেয়,
আর সাবানের ফেনা দিয়ে পাগলের মতো সেই দাগ তুলতে যায়—
তখন সে দেখে, সুতো ছিঁড়ে যায় কিন্তু দাগের ছায়াটা থেকেই যায়।
ঠিক তখনই একলা বাথরুমের নিভু নিভু বাল্বের নিচে
নেমে আসে ‘প্রথম নিরবতা’।
সেই নিরবতা মানুষের চোখে চোখ রেখে জানিয়ে দেয়—
এই নোংরা পৃথিবীতে নিজেকে নিষ্কলঙ্ক রাখার চেষ্টাটাই আসলে সবচেয়ে বড় অপরাধ।
আর মানুষটা আয়নায় নিজের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে—
সে কোনো বিজয়ী হতে আসেনি;
সে কেবল বুকজুড়ে এক স্থায়ী কালির দাগ বয়ে নিয়ে বেড়ানো
এক নিঃসঙ্গ, অসমাপ্ত বাক্য।
মন্তব্য করুন
মন্তব্য করতে হলে
লগইন
করুন।
মন্তব্যসমূহ (0)
এখনো কোনো মন্তব্য নেই।